১,৩০০ অস্ত্র এখনো নিখোঁজ, শেখ হাসিনা ফিরছেন ডিসেম্বরে: বাংলাদেশের অসমাপ্ত রূপান্তরের ছয় অধ্যায়

২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে নিখোঁজ ১,৩০০+ আগ্নেয়াস্ত্র, প্রতিহিংসার অসামঞ্জস্য, শাসক জোটের ফাটল আর শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন-ঘোষণা — ছয় অধ্যায়ে এক সামগ্রিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ।

বেঙ্গল গেজেট বিশেষ বিশ্লেষণ


একটা সরকার পড়ে গেলেই একটা রাষ্ট্র সংস্কার হয়ে যায় না। ৫ আগস্ট, ২০২৪-এর পর বাংলাদেশ যা পার করেছে, তা ক্ষমতার পটপরিবর্তন — কাঠামোগত পুনর্গঠন সম্পূর্ণ হয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি।


ভূমিকা ও পদ্ধতি নোট

এই প্রতিবেদন ছয়টা অধ্যায়ে বাংলাদেশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটা সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছে — আইনশৃঙ্খলার শূন্যতা থেকে শুরু করে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অসামঞ্জস্য, নতুন নেতৃত্বের জবাবদিহি, শাসক জোটের অভ্যন্তরীণ ফাটল, শেখ হাসিনার ঘোষিত প্রত্যাবর্তন, আর সবশেষে — এই সবকিছু একসাথে রাখলে সামনে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এই সিরিজের উদ্দেশ্য কাউকে ধ্বংস করা না, বরং ক্ষমতার আচরণ নথিভুক্ত করা — সব পক্ষের জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করে। যেখানে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না, সেখানে তা স্পষ্টভাবে “অভিযোগ” বা “বিতর্ক” হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে না। যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া মূল প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে, তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; যেখানে পাওয়া যায়নি, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটা বড় দাবির সাথে সূত্র যুক্ত আছে, আর নিবন্ধের শেষে সম্পূর্ণ তথ্যসূত্র তালিকা দেওয়া আছে। এই প্রতিবেদন কোনো গোয়েন্দা তথ্য বা অপ্রকাশিত সূত্রের ভিত্তিতে তৈরি না — এটি সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন, সরকারি বিবৃতি ও স্বীকৃত বিশ্লেষকদের প্রকাশ্য মন্তব্যের ভিত্তিতে করা সংকলন ও বিশ্লেষণ।


অধ্যায় ১: যে দেশে থানা পুড়েছিল, সেই দেশে এখনো পুলিশ ভয় পায়

৫ আগস্ট, ২০২৪। একটা সরকার পড়ে গেল, একটা যুগ শেষ হলো। কিন্তু যে প্রশ্নটা সেদিনের পর থেকে এখনো ঝুলে আছে, সেটা হলো — রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা, আসলে কতটা মেরামত হয়েছে? প্রায় দুই বছর পর, উত্তরটা স্বস্তিদায়ক না।

সেই রাতে যা হারিয়ে গিয়েছিল

৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে ৪৬০টির বেশি পুলিশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে ১১৪টি থানা। পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে লুট হয় প্রায় ৫,৭৫০-৫,৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র, আর ৬ লাখ ৫২ হাজারের বেশি গোলাবারুদ। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান না — প্রতিটা “নিখোঁজ” অস্ত্র মানে সমাজে ভাসমান একটা সম্ভাব্য প্রাণহানির উৎস।

দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব বদলেছে, কিন্তু প্যাটার্নটা এক — উদ্ধার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ। জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সর্বশেষ হিসাবে প্রায় ১,৩৩৫-১,৩৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, যার মধ্যে সাবমেশিনগান ও চায়নিজ রাইফেলের মতো ভারী অস্ত্রও আছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক নিজেই স্বীকার করেছেন, এসব অস্ত্র “অপরাধীদের কাছে অবৈধ অস্ত্রের মজুত হিসেবে যোগ হয়েছে,” আর গত এক বছরে গুলি করে শতাধিক মানুষ খুন হওয়ার পেছনে এই লুট হওয়া অস্ত্রই ব্যবহৃত হয়েছে বলে পুলিশ নিজেই বলছে।

এখানে সাধারণ মানুষের জন্য প্রশ্নটা সহজ — যে অস্ত্র থানা থেকে হারিয়ে গেছে, সেটা এখন কার হাতে? উত্তরটা কেউ নিশ্চিতভাবে দিতে পারছে না।

যখন গুজব একটা মানুষকে পুড়িয়ে মারে

আইনশৃঙ্খলার শূন্যতা শুধু অস্ত্রের সংখ্যায় দেখা যায় না — দেখা যায় মানুষের আচরণে। গত দুই বছরে অন্তত তিনটা আলাদা ঘটনা দেখা গেছে, যেখানে জনতা নিজেই বিচারক-জল্লাদ দুটোই হয়ে উঠেছে।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং — ৫ আগস্টের দিনই পুলিশ ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের গুলিতে নয়জন নিহত হওয়ার পর ক্ষুব্ধ জনতা থানা জ্বালিয়ে দেয়। সেই আগুনে মারা যান এসআই সন্তোষ। পাঁচ মাস পর, জানুয়ারি ২০২৬-এ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতা এক ভিডিওতে গর্বের সাথে বলেন — “বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু জ্বালাই দিয়েছিলাম।” এই স্বীকারোক্তি যতটা আইনি প্রশ্ন তোলে, ততটাই তোলে নৈতিক প্রশ্ন — একটা মানুষের মৃত্যুকে এভাবে হুমকির ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা কতটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে আমাদের রাজনীতিতে।

ভালুকা, ময়মনসিংহ — ডিসেম্বর ২০২৫-এ পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কারখানার ভেতরেই মারধর শুরু হয়, তারপর বাইরে নিয়ে গিয়ে গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া হয়। র‍্যাব নিজে তদন্ত করে জানায় — অভিযোগের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যাকেই জিজ্ঞেস করা হয়েছে, সবাই “শুনেছি” বলেছে, কেউ নিজে দেখেনি বা শোনেনি। নিহতের পরিবারের দাবি, কারখানায় ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাকে খুন করা হয়েছে।

উখিয়া, কক্সবাজার — মে ২০২৬-এ ফেসবুকে একটা “হা হা” রিঅ্যাক্ট নিয়ে বিরোধ থেকে শুরু হওয়া সহিংসতায় ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান মা ছৈয়দা বেগম। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চাঁদাবাজি চালাচ্ছিল, এই ঘটনা তারই ফল। বিপরীতে অভিযুক্তদের একজন দাবি করেছেন, নারীটির “স্বাভাবিক মৃত্যু” হয়েছে। দুই বিপরীত বয়ান এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

তিনটা ঘটনার মধ্যে মিল কী? প্রতিটাতেই একটা অভিযোগ (সত্যি বা মিথ্যা) মুহূর্তের মধ্যে জনতাকে বিচারকের আসনে বসিয়ে দিয়েছে, আর রাষ্ট্রের আইনি প্রক্রিয়া পৌঁছানোর আগেই একটা মানুষ মারা গেছে।

পুলিশ কেন পিছিয়ে থাকছে

এই প্রতিটা ঘটনায় একটা কমন থ্রেড আছে — পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ হয়ে গেছে, অথবা পুলিশ নিজেই পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে। ভালুকায় শিল্প পুলিশের এসপি নিজেই স্বীকার করেছেন — খবর পেতে দেরি হয়েছে, ততক্ষণে ৮-১০ হাজার মানুষ জড়ো হয়ে গেছে।

এর পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার সংকট — জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের একাংশের ভূমিকা নিয়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তার রেশ এখনো কাটেনি। থানায় ঢুকে পুলিশকে হুমকি দেওয়ার ভিডিও এই সময়ে বিরল কিছু না। দ্বিতীয়ত, লুট হওয়া অস্ত্র এখনো সমাজে ছড়িয়ে থাকায় প্রতিটা জনতার জমায়েতে সম্ভাব্য অস্ত্রের উপস্থিতি একটা বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করে, যা পুলিশের সিদ্ধান্ত নেওয়াকে আরও ধীর করে দেয়। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে “কাকে গ্রেপ্তার করলে কী প্রতিক্রিয়া হবে” — এই হিসাব-নিকাশ মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তহীনতার একটা বড় কারণ বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সাধারণ মানুষের জন্য এর মানে কী

যে অস্ত্র থানা থেকে হারিয়েছে, সেটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যতটা ব্যবহৃত হচ্ছে, ঠিক ততটাই ব্যবহৃত হচ্ছে সাধারণ ছিনতাই, ডাকাতি আর ব্যক্তিগত শত্রুতার খুনে। যে “মব জাস্টিস” সংস্কৃতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে শুরু হয়েছিল, সেটাই এখন একটা ফেসবুক রিঅ্যাক্ট বা অপ্রমাণিত ধর্ম অবমাননার গুজবেও মানুষ মেরে ফেলছে। রাষ্ট্র যখন সবচেয়ে মৌলিক প্রতিশ্রুতি — নিরাপত্তা — পূরণ করতে পারে না, তখন সেই শূন্যতা কেউ না কেউ পূরণ করবে, আর সেটা সবসময় ন্যায়বিচার দিয়ে হয় না।


অধ্যায় ২: হাজারো মামলা, অথচ শীর্ষ নেতৃত্ব অধরা — আওয়ামী লীগ দমনের অসামঞ্জস্য চিত্র

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চক্র শুরু হয়েছে, তার স্কেলটা বোঝা দরকার সংখ্যা দিয়ে — কিন্তু সংখ্যার পেছনের মানুষগুলোকেও দেখা দরকার।

সংখ্যাটা এত বড় যে কারো কাছে সঠিক হিসাব নেই

আওয়ামী লীগ নিজেই দাবি করছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মাত্র ২০ মাসে সারা দেশে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লক্ষাধিক মামলা হয়েছে। দলটি নিজেও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিতে পারেনি, আর পুলিশ এই দাবিকে “প্রপাগান্ডা ও অবাস্তব” বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তুলনাটা তাৎপর্যপূর্ণ — বিএনপির বিরুদ্ধে ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ১৮ বছরে, মোট মামলা হয়েছিল প্রায় দেড় লাখ। আওয়ামী লীগ যদি মাত্র ২০ মাসে সেই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার দাবি করে, সংখ্যাটা যাচাই করা না গেলেও এটা বলে দেয় — চাপের গতি কতটা তীব্র।

স্থানীয় পর্যায়ে বিক্ষিপ্তভাবে যেসব সংখ্যা গণমাধ্যমে এসেছে, তার কয়েকটা এক জায়গায় করলে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়:

এই মামলাগুলোর মধ্যে কতগুলো প্রকৃত অপরাধের সাক্ষ্যভিত্তিক, আর কতগুলো নিছক নাম-অন্তর্ভুক্তি — সেই পার্থক্য যাচাই করার কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নেই। যিনি সত্যিই জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, আর যিনি শুধু স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় পদে ছিলেন — দুজনের নামই একই মামলার এজাহারে চলে যাচ্ছে।

যাদের ধরার কথা, তারাই সবচেয়ে দূরে

এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর অসামঞ্জস্যটা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ৭৭ জন শীর্ষ নেতার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন — বাকিরা এখনো পলাতক। শেখ হাসিনা নিজে ভারতে, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও আত্মগোপনে। অর্থাৎ, যাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ — হত্যা, গণহত্যায় নির্দেশদান, দমন-পীড়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া — তারা প্রায় সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ তৃণমূল পর্যায়ে, যেখানে সাধারণ কর্মী, ওয়ার্ড কমিটির সদস্য, এমনকি ৭০ বছর বয়সী স্থানীয় নেতাও গ্রেপ্তার হচ্ছেন হাজারে হাজারে।

এই বৈষম্যটাই আওয়ামী লীগের ভেতরে একটা নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করছে — যে বয়ান বিএনপির এক নেতা নিজেই স্বীকার করেছেন। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেছেন, আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী যারা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না, শুধু নীতিগত কারণে দল করতেন — তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ আছে। তাদের ভাষায়, শীর্ষ নেতৃত্ব নিজের পরিবার নিয়ে নিরাপদে পালিয়ে গেছে, সাধারণ কর্মীদের রেখে গেছে জনগণের ক্রোধের সামনে।

এই ক্ষোভটা বোঝা জরুরি — কারণ এটাই পরবর্তী ঘটনাগুলোর ভিত্তি তৈরি করছে।

ছাত্রলীগ যখন আবার রাস্তায়

নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরও ছাত্রলীগ একেবারে অদৃশ্য হয়ে যায়নি। গত কয়েক মাসে গাজীপুরে একাধিকবার প্রকাশ্য মিছিল হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ৩ জুলাই ২০২৬-এর — গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির মোড়ল বিদেশ থেকে দেশে ফিরেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে কয়েকশ’ নেতাকর্মী নিয়ে মিছিল করেন, প্রকাশ্যে শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন। তার ভাষা ছিল স্পষ্টত চ্যালেঞ্জিং — “গাজীপুরের মাটিতে একটাই আইন চলবে, শেখ হাসিনা। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, জেল-জুলুমের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।”

এর আগে ২১ জুন আরেকটি মিছিলে পুলিশকে সরাসরি হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে — ভিডিওতে শোনা যায়, “সামনে আসবি না, মাইরা ফালামু।” পরদিন পুলিশি অভিযানে ৩০ জন গ্রেপ্তার হয়।

এই প্যাটার্নটা লক্ষণীয়। একদিকে সরকার বলছে সংগঠনটা নিষিদ্ধ, আরেকদিকে বাস্তবে সেই সংগঠনের নেতারা প্রকাশ্যে মহাসড়কে জমায়েত করতে পারছেন, বিদেশ থেকে ফিরেই মিছিলের নেতৃত্ব দিতে পারছেন। প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া মূলত ঘটনা-পরবর্তী — তদন্ত, বিক্ষিপ্ত গ্রেপ্তার — প্রতিরোধমূলক না।

দুটো ঘটনা একসাথে রাখলে যা দেখা যায়

মামলার অসামঞ্জস্য (তৃণমূলে হাজারো, শীর্ষে হাতেগোনা) আর ছাত্রলীগের রাস্তায় প্রকাশ্য ফিরে আসা — এই দুটো একসাথে দেখলে একটা সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। যে ব্যবস্থা “ন্যায়বিচার” এর নামে চলছে, সেটা যদি ক্ষমতাবানদের ধরতে ব্যর্থ হয় আর ক্ষমতাহীনদের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করে, তাহলে সেই ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি হওয়ার বদলে ক্ষোভ জমতে থাকে। আর সেই ক্ষোভ যখন প্রাতিষ্ঠানিক পথ খুঁজে পায় না, তখন সেটা প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ আর প্রকাশ্য মিছিলের ভাষায় ফিরে আসে — যেমনটা গাজীপুরে দেখা যাচ্ছে।


অধ্যায় ৩: ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা তরুণ নেতৃত্ব — প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতা আর জবাবদিহির প্রশ্ন

জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতার কাছাকাছি চলে এলেন — কেউ উপদেষ্টা হিসেবে, কেউ নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতৃত্বে, কেউ সংসদ সদস্য হিসেবে — তখন থেকেই তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে একটা বিশেষ ধরনের নজরদারি। এই নজরদারির একটা অংশ ন্যায্য জবাবদিহির দাবি, আরেকটা অংশ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সুপরিকল্পিত আক্রমণ — দুটোকে আলাদা করাই এই অধ্যায়ের কাজ।

হলফনামা যা বলছে

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্য নথি, তাই এখান থেকেই শুরু করা যায়।

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হলফনামায় নিজের সম্পদ দেখিয়েছেন প্রায় ৪০ লাখ টাকা — কোনো জমি বা ভবন নেই, স্ত্রীসহ মিলিয়ে ২২ লাখ টাকার স্বর্ণ ও ২৫ লাখ নগদ। উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের হলফনামায় কোনো বাড়ি, গাড়ি বা ভবন দেখানো হয়নি, নগদ সাড়ে তিন লাখ টাকার কম; তবে আয়কর নথিতে তার মোট সম্পদ দেখানো হয়েছে ৩৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা, বার্ষিক আয় ২৮ লাখ টাকা। দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর সম্পদ ৫০ লাখ টাকা — এর মধ্যে ২৬ লাখ টাকার স্বর্ণ ও সাড়ে ১৩ লাখ নগদ, বাড়ি বা গাড়ির তথ্য নেই। যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদনে সম্পদের অঙ্ক কিছুটা আলাদা এসেছে (৪৬ লাখ থেকে ৯৮ লাখ পর্যন্ত উল্লেখ পাওয়া যায়) — তবে সবগুলো সূত্রই একমত যে তার নগদ অর্থ (৩৫ লাখ টাকা) তার নিজের বাবার সম্পদের তুলনায় প্রায় ১৮ গুণ বেশি, যেটা উল্লেখযোগ্য কারণ বাবা আমিরুল ইসলামও একই আসনে (নোয়াখালী-৬) প্রার্থী ছিলেন।

এই সংখ্যাগুলো নিজে থেকে কোনো অপরাধ প্রমাণ করে না — একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতার হাতে কয়েক লাখ টাকা থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু নির্বাচন বিশ্লেষকরা যেটা লক্ষ্য করেছেন, সেটা হলো এই তরুণদের জীবনযাত্রায় আকস্মিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত — আর সেই ইঙ্গিতটাই পরবর্তী প্রতিটা বিতর্কের পটভূমি তৈরি করে দিয়েছে।

গাড়ি বিতর্ক: যতটা সহজ মনে হয়েছিল, ততটা না

হাসনাত আবদুল্লাহর গাড়ি নিয়ে বিতর্কটা ভালো উদাহরণ, কীভাবে একটা জটিল বিষয় সরলীকৃত হয়ে যায়। জানুয়ারি ২০২৬-এ তিনি ও সংসদের সব সদস্য প্রতিশ্রুতি দেন — ট্যাক্স-ফ্রি (শুল্কমুক্ত) গাড়ি ও প্লট সুবিধা তারা নেবেন না। এপ্রিলে সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি প্রস্তাব দেন, ডিসি-ইউএনওদের মতো এমপিদেরও একটা সরকারি মালিকানাধীন গাড়ি (শুধু দায়িত্বকালীন ব্যবহারের জন্য, মালিকানা না) দেওয়া যায় কিনা — যুক্তি হিসেবে বলেন, এমপিদের মাসে ৭০ হাজার টাকা গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা দেওয়া হয় অথচ তাদের গাড়িই নেই। মিডিয়াতে এটা “ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি চাইলেন হাসনাত” হিসেবে প্রচারিত হলে তিনি পরদিনই সংসদে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করেন — তিনি মালিকানা চাননি, শুধু ব্যবহারের সুযোগ চেয়েছেন, আর এটা তার আগের প্রতিশ্রুতির বিরোধী না। স্পিকার নিজেও এই ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে ধন্যবাদ জানান।

অর্থাৎ, এটাকে “প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ” বলা তথ্যগতভাবে অসম্পূর্ণ একটা বর্ণনা হবে।

আসিফ মাহমুদ: তিনটা আলাদা বিতর্ক

চাঁদাবাজির অভিযোগ। আগস্ট ২০২৫-এ গুলশানে সাবেক এমপির বাসায় চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার জানে আলম অপু এক ভাইরাল ভিডিওতে দাবি করেন, ঘটনার দিন গুলশানে আসিফ মাহমুদের সাথে তার দেখা হয়েছিল। আসিফ মাহমুদ সরাসরি অস্বীকার করেন, বলেন এটা “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” এবং অপুর বক্তব্য জোর করে নেওয়া হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি স্বীকার করেন, তিনি প্রায়ই রাতে “৩০০ ফুট” এলাকার একটা রেস্তোরাঁয় হাঁসের মাংস খেতে যান — কিন্তু নির্দিষ্ট সেই দিনে গিয়েছিলেন কিনা মনে করতে পারছেন না। কোনো পক্ষই চূড়ান্ত প্রমাণ হাজির করতে পারেনি — এটা এখনো অমীমাংসিত অভিযোগ হিসেবেই আছে।

অস্ত্রের ম্যাগাজিন বিতর্ক। জুন ২০২৫-এ বিদেশযাত্রার সময় বিমানবন্দরে স্ক্যানিংয়ে তার ব্যাগে একটা গুলির ম্যাগাজিন পাওয়া যায়। তিনি ফেসবুকে ব্যাখ্যা দেন — তার লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র আছে (নিরাপত্তার কারণ হিসেবে বলেন, অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের ওপর একাধিকবার হত্যাচেষ্টা হয়েছে), প্যাকিং করার সময় ভুলবশত একটা ম্যাগাজিন ব্যাগে থেকে যায়, সেটা স্ক্যানে ধরা পড়ার পর প্রোটোকল অফিসারের কাছে জমা দেন। সংবাদমাধ্যমকে চাপ দিয়ে খবর সরানোর অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন। এখানে প্রশ্ন থেকে যায় — একজন নতুন উপদেষ্টা এত দ্রুত অস্ত্রের লাইসেন্স কীভাবে পেলেন, প্রচলিত নিয়মে যেখানে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া লাগে — যদিও উচ্চপদস্থ সরকারি ব্যক্তিদের জন্য নীতিমালায় কিছু শর্তে ছাড়ের বিধান আছে বলেও জানা যায়।

বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ। এটা সবচেয়ে গুরুতর এবং সবচেয়ে জটিল। বাংলাভিশনের “ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন” অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত এক প্রতিবেদনে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয় — কুমিল্লার মুরাদনগরে এক পরিবারের তিনজনকে (মা-ছেলে-মেয়ে) হত্যার ঘটনায় স্থানীয় চেয়ারম্যান শিমুল বিল্লালের সংশ্লিষ্টতা এবং তিনি বিল্লাল হোসেনের ছত্রছায়ায় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ; একজন স্কুলশিক্ষিকাকে অবরুদ্ধ করে নির্যাতনের ঘটনায় বিল্লাল হোসেনের সরাসরি নেতৃত্বের অভিযোগ; একজন ব্যবসায়ীকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে চাঁদা আদায় ও সামাজিক-শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে বাধ্য করার অভিযোগ; পুকুর দখল ও গাছ কাটার অভিযোগ। বিল্লাল হোসেন নিজে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ছেলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে বলে প্রতিপক্ষরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। এই অভিযোগগুলো সরাসরি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে না, তার বাবার বিরুদ্ধে — এই পার্থক্যটা রাখা জরুরি, যদিও রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই দুটো মিলিয়ে ফেলা হয়।

আসিফ নজরুল: একটা দাবি যা কখনো প্রমাণিত হয়নি

আইন উপদেষ্টা থাকাকালীন আসিফ নজরুল দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে প্রায় ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক অবৈধভাবে কর্মরত। দায়িত্ব থেকে বিদায়ের ঘোষণার সময়ও তিনি এই দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা পদক্ষেপের হিসাব দিতে পারেননি, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও হতাশা প্রকাশ পেয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। এটা একটা ভালো উদাহরণ, কীভাবে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় একটা বড় দাবি করা সহজ, কিন্তু তার দায়বদ্ধতা রক্ষা করা কঠিন।

হান্নান মাসউদ: দলীয় শৃঙ্খলা যেখানে কাজ করেছে

মে ২০২৫-এ ধানমন্ডিতে হাক্কানী পাবলিশার্সের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফাকে “ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর” আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারে চাপ দিতে গিয়ে তিনজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কর্মী পুলিশের সাথে বাগবিতণ্ডায় জড়ান। পরদিন পুলিশ তাদের হান্নান মাসউদের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো — এনসিপি নিজেই তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়, তিনি ভুল স্বীকার করেন, আর তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর যে তিনি আটক ব্যক্তিদের মূল কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন না, নোটিশ প্রত্যাহার করা হয়। এই একটা ক্ষেত্রে অন্তত অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে কাজ করেছে বলা যায়।

একটা প্যাটার্ন যা সবগুলো ঘটনায় দেখা যায়

এই অধ্যায়ের প্রতিটা ঘটনায় একটা সাধারণ কাঠামো লক্ষণীয় — একটা অভিযোগ ওঠে, প্রায়ই একটা ভাইরাল ভিডিও বা পোস্টের মাধ্যমে; অভিযুক্ত ব্যক্তি সরাসরি প্রকাশ্যে জবাব দেন (ফেসবুক পোস্ট বা সংবাদ সম্মেলনে); আর তারপর সেই জবাব সন্তোষজনক কিনা, সেটা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকে, কোনো স্বাধীন তদন্ত সংস্থা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। এই প্যাটার্নটা এই তরুণ নেতৃত্বের জন্য একটা গঠনগত সমস্যা তৈরি করছে — তারা যতই ব্যক্তিগতভাবে জবাব দিন, প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের অভাবে কোনো অভিযোগই পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয় না, আবার কোনোটাই পুরোপুরি প্রমাণিতও হয় না। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই জনমত তৈরি হচ্ছে — কখনো ন্যায্য সন্দেহের ভিত্তিতে, কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচারণার ভিত্তিতে।


অধ্যায় ৪: যে জোট মিলে স্বৈরাচার হটাল, সেই জোটেই এখন সবচেয়ে গভীর ফাটল

২০২৪-এর আগস্টে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো একসাথে দাঁড়িয়েছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, দুই বছর পর সেই ঐক্য কতটা টিকে আছে? উত্তরটা খুঁজতে গেলে দেখা যায় — ভাঙনটা এখন আর গুঞ্জন নয়, প্রকাশ্য।

“গাদ্দারি” থেকে ককটেল বিস্ফোরণ

নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও তার সাবেক নির্বাচনী মিত্র জামায়াত-এনসিপি জোটের সাথে সম্পর্ক দ্রুত তিক্ত হয়ে উঠেছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রকাশ্যে বলেছেন, “বিএনপি সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা এবং জাতির সঙ্গে গাদ্দারি করছে।” জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এনসিপির “জুলাই পদযাত্রা” কর্মসূচি শুরু হওয়ার সাত দিনের মধ্যেই, ৭ জুলাই ২০২৬-এ সাভারে এনসিপির এক পদযাত্রায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনায় এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব (নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, সারজিস আলম-সহ) উপস্থিত ছিলেন। এনসিপি ও তাদের মিত্র জামায়াত সরাসরি সরকারকে দায়ী করে এটাকে “রাজনৈতিক পরিস্থিতির চরম অবনতি” আখ্যা দিয়েছে — যদিও এই অভিযোগের কোনো স্বাধীন তদন্তভিত্তিক নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি, আর সরকারের পক্ষ থেকে এই দায় স্বীকার করা হয়নি।

এই ঘটনাটা তাৎপর্যপূর্ণ একটা কারণে — গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা সংঘর্ষ হলেও কোনো সমাবেশে ককটেল বা হাতবোমা নিক্ষেপের ঘটনা এই সময়ে বিরল ছিল। বিশ্লেষকদের অনেকে এটাকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবনতির পূর্বলক্ষণ হিসেবে দেখছেন।

জামায়াত-এনসিপির মধ্যেও সবসময় সুসম্পর্ক ছিল না। ২০২৫ সালের অক্টোবরে “জুলাই সনদ” স্বাক্ষরের পর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জামায়াতের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর পদ্ধতি) আন্দোলনকে “সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রতারণা” বলে আখ্যা দেন, অভিযোগ করেন এটা গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা থেকে আলোচনা সরিয়ে নেওয়ার একটা কৌশল। জামায়াতের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

একটা সরকারি অনুষ্ঠান যা জাতীয়তাবাদী অনুভূতিতে আঘাত করেছে

৪ জুলাই ২০২৬-এ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয় — একটা মিউজিক্যাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, যেখানে মার্কিন পতাকা উড়েছে, আর সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও চিফ হুইপ বক্তব্য রেখেছেন দুই দেশের “গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বন্ধুত্বের প্রতীক” হিসেবে এই আয়োজনকে বর্ণনা করে।

এই ঘটনা নিয়ে একাধিক মহল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। বাসদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ স্মরণ করিয়ে দেন — ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করেছিল, তাই সংসদ ভবনের মতো জায়গায় তাদের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” হেফাজতে ইসলাম এই আয়োজনকে “জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত” বলে বিবৃতি দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এক নেতা এটাকে “দেশের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্ত” বলে অভিহিত করেছেন। সাংবাদিক আমীন আল রশীদ তার বিশ্লেষণে প্রশ্ন তুলেছেন — একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের সংসদ ভবনে আরেকটা দেশের পতাকা উড়িয়ে তাদের স্বাধীনতা দিবস পালনের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল, আর ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা বিবেচনায় এটা “নিছক আনুষ্ঠানিকতা” ভাবার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে সরকারপক্ষের যুক্তি ভিন্ন — চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এটাকে দুই দেশের “পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক” বলেছেন, আর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদ ভবনের নকশাকার মার্কিন স্থপতি লুই কানের প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই গভীর।

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিতর্ক

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আরেকটা বিষয় জড়িয়ে আছে — নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটা “পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি” স্বাক্ষর করে, যেখানে বাংলাদেশি পণ্যে শুল্ক ৩৭% থেকে কমিয়ে ১৯%-এ আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই চুক্তি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক মহল থেকে ব্যাপক সমালোচনা এসেছে — মূল অভিযোগ হলো, এটা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে, নির্বাচনের ঠিক আগে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়াই স্বাক্ষর করা হয়েছে; চুক্তিতে ডিজিটাল বাণিজ্য, কাস্টমস ডেটা এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান সংক্রান্ত এমন কিছু শর্ত আছে যা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে বলে সমালোচকরা মনে করছেন। CPD-র মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানও এই চুক্তির কিছু শর্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তবে এখানেও দুই পক্ষের কথা আছে — চুক্তির পক্ষে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে এটা মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা রক্ষা করবে, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে, আর চুক্তিতে রি-নেগোসিয়েশন ও এক্সিট ক্লজ থাকায় এটা “চিরস্থায়ী আত্মসমর্পণ” না। প্রসঙ্গত, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট পরে ৩৭% শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি বাতিল করে দেওয়ায় গোটা চুক্তির মূল যুক্তিই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ — একটা গুরুত্বপূর্ণ স্পষ্টীকরণ

রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই জামায়াতের বিরুদ্ধে “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি” ও “স্বাধীনতাবিরোধী” তকমা ব্যবহার করা হয় — এটা একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে গভীরভাবে বিতর্কিত একটা অভিযোগ, যা আওয়ামী লীগ ও এর মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে তুলে আসছে, আর জামায়াত নিজে ও তাদের সমর্থকরা এটা প্রবলভাবে অস্বীকার করে। এই প্রতিবেদনে এই অভিযোগটাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে না, বরং একটা দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবেই তুলে ধরা হলো — কে ঠিক, সেই রায় দেওয়া এই প্রতিবেদনের কাজ না।

এই ভাঙন কেন গুরুত্বপূর্ণ

২০২৪-এর আগস্টে যে ঐক্য আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, সেই ঐক্যের ভেতরকার ফাটল এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক বাস্তবতা। এটা গুরুত্বপূর্ণ দুটো কারণে। প্রথমত, শাসক জোটের অভ্যন্তরীণ কোন্দল রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মনোযোগ ও সম্পদ বিভাজিত করছে, ঠিক যে সময় আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে ও শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, এই বিভক্তি একটা রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে — আওয়ামী লীগের জন্য না হলেও, অন্তত এমন একটা পরিস্থিতির জন্য যেখানে কোনো একক শক্তি স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না।


অধ্যায় ৫: “ডিসেম্বরে ফিরব” — একটা ঘোষণা যা রাষ্ট্রকেই দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে

১০ জুলাই ২০২৬ রাতে, রয়টার্সকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন — তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরবেন, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। ৭৮ বছর বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশে ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেফতার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তারপরও আমাকে যেতে হবে।” এই একটা ঘোষণা যতটা রাজনৈতিক আলোড়ন তুলেছে, ঠিক ততটাই উন্মোচন করেছে রাষ্ট্রের নিজের ভেতরকার বিভ্রান্তি।

একই ব্যক্তি, দুই ভিন্ন কথা — এক সপ্তাহের ব্যবধানে

৫ জুলাই, রয়টার্স সাক্ষাৎকার প্রকাশের আগে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট বলেছিলেন — শেখ হাসিনার দেশে ফিরতে কোনো আইনি বাধা নেই, বরং রাষ্ট্রপক্ষ চায় তিনি ফিরে এসে আদালতের মুখোমুখি হন এবং নিজের বিরুদ্ধে হওয়া রায় আইনিভাবে চ্যালেঞ্জ করুন।

১২ জুলাই, রয়টার্স সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর, একই চিফ প্রসিকিউটর সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে বলেন — শেখ হাসিনার সরাসরি দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের কোনো আইনি সুযোগ নেই। তিনি স্পষ্ট করেন — শেখ হাসিনা এখন ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে নির্বাসনে আছেন, তাই তার ফেরা নির্ভর করছে দুই দেশের কূটনৈতিক ও আইনি সমন্বয়ের ওপর, স্বেচ্ছায় ফেরার সুযোগ নেই। দেশের মাটিতে পা রাখামাত্রই তাকে গ্রেপ্তার করে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হবে।

এই দুই বক্তব্যের মাঝের সময়টুকুতেই মূল পরিবর্তনটা ঘটেছে — যতক্ষণ প্রশ্নটা তাত্ত্বিক ছিল, রাষ্ট্র বলেছে “আসুন, আইনি বাধা নেই।” যখনই প্রশ্নটা একটা নির্দিষ্ট তারিখসহ বাস্তব হয়ে উঠল, রাষ্ট্রের অবস্থান সরে গেল কূটনৈতিক জটিলতার দিকে।

শুধু চিফ প্রসিকিউটরই না — স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যও সবসময় সমন্বিত না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একাধিকবার বলেছেন, তারা প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠিয়েছেন এবং আশা করছেন ভারত তাকে ফেরত পাঠাবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, শেখ হাসিনা কী বলছেন না বলছেন সেটা “একেবারে প্রাসঙ্গিক না” — কারণ সিদ্ধান্তটা তার নিজের হাতে নেই।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা — শেখ হাসিনার ফেরা আদৌ তার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে কিনা। তারা মনে করিয়ে দেন, তিনি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাতেও ভারতে যাননি — গণঅভ্যুত্থানের সময় নিরাপত্তা সংকটের মুখে ভারতের “সবুজ সংকেতে” তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন। তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট বর্তমানে বাতিল, তাই ফিরতে হলে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ট্রাভেল পাস লাগবে, যা সরকারের সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব না। ফলে তার রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্য প্রকৃতপক্ষে একটা বাস্তব পরিকল্পনা, নাকি নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রাখা বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার একটা কৌশল — এই নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যেই মতভেদ আছে।

বিরোধী দল থেকেও ভিন্ন সুর

চিফ প্রসিকিউটরের সাথে দ্বন্দ্বপূর্ণ একটা বক্তব্য এসেছে খোদ বিএনপির ভেতর থেকেই। ৬ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্পষ্ট বলেন — “আইনগত অবশ্যই কোনো বাধা নেই। উনি ফিরবেন, ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন, জামিন চাইবেন। আমাদের নরমাল সিআরপিসির যে প্রসিডিউর, সেটিই উনি ফলো করবেন।” এই বক্তব্য চিফ প্রসিকিউটরের ১২ জুলাইয়ের অবস্থানের সরাসরি বিপরীত — প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের ভেতরেই এই প্রশ্নে ঐকমত্য নেই।

অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিবের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীসহ দলের অন্যান্য নেতারা আরও কঠোর অবস্থানে। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি বলেছেন, “হাসিনা ফিরলে বিচার হবে, আমরা ফাঁসির দড়ি প্রস্তুত করে অপেক্ষা করছি।”

আইনি কাঠামো — কী বলছে আইন নিজে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন। চিফ প্রসিকিউটর নিজেই উল্লেখ করেছেন — এই আইনের ধারা ২১(৩) অনুযায়ী রায় ঘোষণার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করতে হয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে (নভেম্বর ২০২৫-এর মৃত্যুদণ্ডাদেশ) সেই সময় ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে, কারণ তিনি দেশে ফিরে আপিল করেননি। এখন প্রশ্ন হলো, বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে দেরি মার্জনার আবেদন করা যায় কিনা — আইন অনুযায়ী এই দরজা “পুরোপুরি বন্ধ” এমনটা বলার সুযোগ নেই, আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলেও যাবে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আদালত, তাও দেশে ফেরার পরই।

প্রত্যর্পণ চুক্তি। ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি (২০১৩) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণযোগ্য গণ্য করতে হলে সেই অপরাধ উভয় দেশের আইনে অন্তত এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হতে হবে — শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই শর্ত সহজেই পূরণ হয় যেহেতু তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় আছে। কিন্তু চুক্তি প্রয়োগ সম্পূর্ণ ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, আর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা কূটনৈতিক সূত্রে “নিতান্তই কম” বলে জানা যাচ্ছে।

বন্দি প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক নজির — ২০০৭। এটা প্রথমবার না যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ২০০৭ সালের এপ্রিলে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে দেশে ফিরতে বাধা দেয়, এই যুক্তিতে যে তার ফেরা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল। কিন্তু ২৫ এপ্রিল প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়, আর ৭ মে তিনি দেশে ফেরেন — হাজার হাজার মানুষ তাকে স্বাগত জানায়। এরপরও ১৬ জুলাই ২০০৭-এ তাকে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, প্রায় ১১ মাস কারাবন্দি থাকেন, ২০০৮ সালের ১১ জুন মুক্তি পান। এই ইতিহাসটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটা দেখায় — অতীতে “ফেরা” এবং “গ্রেপ্তার এড়ানো” দুটো ভিন্ন লড়াই ছিল, আর সেই লড়াইয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে টিকে ছিলেন। তবে সেই সময়কার প্রেক্ষাপট (তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সাধারণ ফৌজদারি অভিযোগ) আর বর্তমান প্রেক্ষাপটের (নির্বাচিত সরকার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ড) মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে, তাই সরাসরি তুলনা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

পরিবারের ভেতরে ভিন্ন সুর

শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোও লক্ষণীয়। ফেব্রুয়ারিতে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন, আওয়ামী লীগ যদি রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, নেতৃত্বে হয়তো আর শেখ হাসিনাকে দেখা নাও যেতে পারে। জুনে কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে তিনি জুলাই আন্দোলনে প্রাণহানির “পূর্ণ দায়” নিজের ওপর নেন এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনকে “একতরফা” বলে মন্তব্য করেন। এই বক্তব্যগুলো একসাথে পড়লে একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় — পরিবারের অন্তত একাংশ দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থান বদলের চেষ্টা করছে।

ভারত কেন চুপ — একটা ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একাধিকবার নিশ্চিত করেছেন — পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হয়েছে, “বারবার।” কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক বা এমনকি স্পষ্ট প্রত্যাখ্যানমূলক আনুষ্ঠানিক জবাবও আসেনি — শুধু নীরবতা। কূটনৈতিক সূত্রে বলা হচ্ছে, নয়াদিল্লির ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা “নিতান্তই কম।”

এই নীরবতাটা কাকতালীয় না। আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ আইনে একটা সাধারণ নীতি আছে — “রাজনৈতিক অপরাধ” (political offence) হিসেবে বিবেচিত মামলায় প্রত্যর্পণ অস্বীকার করার সুযোগ থাকে, আর একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে করা মামলাকে প্রায়ই ক্ষমতাচ্যুতকারী পক্ষ “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” বলে দাবি করতে পারে বলে ভারত এই যুক্তি ব্যবহার করার সুযোগ রাখে, আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না দিয়েও।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এই প্রশ্নে একটা সাধারণ মূল্যায়ন দেখা যায়, যদিও এটা অনুমানভিত্তিক বিশ্লেষণ, নিশ্চিত পূর্বাভাস না: এক, দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত বিনিয়োগ — শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল ভারতের দৃষ্টিতে সবচেয়ে অনুকূল অবস্থানে, আর একজন নেতাকে হস্তান্তর করা মানে ভারতের দৃষ্টিতে একটা “পরীক্ষিত” সম্পর্কের সমাপ্তি ঘোষণা করা। দুই, মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্ন — যেসব দেশে প্রাণদণ্ড কার্যকর হতে পারে, সেসব ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বাড়তি সতর্কতা দেখানোর নজির আছে। তিন, রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রশ্ন — ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না দিয়েও ব্যবহারিকভাবে তাকে “অতিথি” হিসেবে আচরণ করছে বলে বোঝা যায়, যা প্রত্যক্ষ সংঘাত এড়িয়ে সবচেয়ে কম-ঝুঁকির অবস্থান বজায় রাখতে সহায়ক।

দেশের ভেতরে বর্তমানে একটা লক্ষণীয় প্রবণতা আছে — কিছু রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন ভারতকে “আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষক” হিসেবে তুলে ধরে জনমতকে ভারতবিরোধী দিকে চালিত করার চেষ্টা করছে। তবে এই প্রবণতাকে কোনো একক নির্দিষ্ট ঘটনার সাথে সরাসরি যুক্ত করাটা প্রমাণ-সমর্থিত না — এটা একটা বিস্তৃত রাজনৈতিক আবহ, নির্দিষ্ট ঘটনার সরলীকৃত ব্যাখ্যা না। একইভাবে, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় রাজ্যগুলোতে বিজেপির আঞ্চলিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ-সিদ্ধান্তের সাথে সরাসরি, একরৈখিকভাবে যুক্ত করাও এই মুহূর্তে অনুমানভিত্তিক বিশ্লেষণ — একটা সম্ভাব্য প্রভাবক হিসেবে উল্লেখযোগ্য, নিশ্চিত কার্যকারণ হিসেবে প্রমাণিত না।

সব মিলিয়ে ছবিটা

ডিসেম্বরের আগে একটা জিনিস স্পষ্ট — কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না ঠিক কী ঘটবে। রাষ্ট্র নিজেই সিদ্ধান্তহীন, একই কর্মকর্তার বক্তব্যে সপ্তাহের ব্যবধানে স্ববিরোধিতা দেখা যাচ্ছে। বিরোধী দলের ভেতরেই মতভেদ। আইনি কাঠামো জটিল, একাধিক পথ খোলা কিন্তু কোনোটাই নিশ্চিত না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা — শেখ হাসিনা নিজে সত্যিই ফিরতে চান, নাকি এটা একটা রাজনৈতিক কৌশল — তার উত্তর কারো কাছেই নেই, তার নিজের দলের ভেতরেও না।


অধ্যায় ৬ (শেষ অধ্যায়): অস্ত্র এখনো নিখোঁজ, নেত্রী ফিরছেন ডিসেম্বরে — ঝুঁকি ও সামনের সম্ভাবনা

আগের পাঁচটা অধ্যায় যদি আলাদা আলাদা পাঁচটা ছবি হয়, তাহলে এই শেষ অধ্যায়ের কাজ একটাই — ছবিগুলো পাশাপাশি রেখে দেখা, একসাথে কী দেখা যায়।

প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, ৫ আগস্টের রাতে থানা থেকে লুট হওয়া প্রায় ৫,৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে দুই বছর পরও ১,৩০০-এর বেশি এখনো নিখোঁজ। পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, শেখ হাসিনা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন, নিজেই আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন — “তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তারপরও আমাকে যেতে হবে।”

এই দুটো তথ্য আলাদাভাবে পড়লে দুটো আলাদা খবর মনে হয়। কিন্তু পাশাপাশি রাখলে একটাই প্রশ্ন দাঁড়ায় — যে রাষ্ট্র নিজের হারানো অস্ত্রই এখনো পুরোপুরি খুঁজে পায়নি, সেই রাষ্ট্র ডিসেম্বরে যখন তার সবচেয়ে বিতর্কিত, সবচেয়ে মেরুকরণ-সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ঘটনার মুখোমুখি হবে, তখন কী ঘটতে পারে?

এই অধ্যায়ে আমরা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করছি না। আমরা যা করছি তা হলো — আগের পাঁচ অধ্যায়ে প্রতিষ্ঠিত তথ্যগুলোকে একসাথে রেখে দেখা, কোন কোন দিক থেকে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, আর কোন কোন সম্ভাব্য পরিণতি এখন যুক্তিসঙ্গতভাবে কল্পনা করা যায়।

ঝুঁকি ১: যে অস্ত্র হারিয়ে গিয়েছিল, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অজানা চলক

পুলিশ সদর দপ্তরের সবশেষ হিসাবে, জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত লুট হওয়া ৫,৭৬৩টি অস্ত্রের মধ্যে ১,৩৩৫ থেকে ১,৩৬২টি এখনো উদ্ধার হয়নি — সঙ্গে প্রায় আড়াই লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা সরাসরি বলেছেন, নির্বাচনের আগে এই নিখোঁজ অস্ত্র “গুরুতর ও প্রকৃত উদ্বেগের বিষয়।” বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মুনীরুজ্জামান জানিয়েছেন, দেড় বছর পার হয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্ষমতা এখনো দুর্বল।

এই অস্ত্রগুলোর একটা বড় অংশ যে অপরাধী চক্রের হাতে চলে গেছে, সেটা পুলিশ নিজেই স্বীকার করেছে — ছিনতাই, ডাকাতি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলায় এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ এমন সম্ভাবনার কথাও বলেছেন যে, কিছু অস্ত্র জুলাই-আগস্টে জেল ভেঙে পালানো অন্তত ৭০ জন বন্দির হাত ধরে পাহাড়ি এলাকায় বা সীমান্ত পেরিয়ে চলে যেতে পারে — যদিও এটা একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, নিশ্চিত সিদ্ধান্ত না।

এখানেই প্রথম অধ্যায়ের সাথে যোগসূত্র তৈরি হয়। প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছিলাম, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে শুরু হওয়া অস্ত্র-সহিংসতা কীভাবে ধীরে ধীরে সাধারণ অপরাধেও ছড়িয়ে পড়েছে। এখন প্রশ্নটা হলো — ডিসেম্বরে যদি সত্যিই একটা বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে, তাহলে সমাজে ভাসমান এই ১,৩০০-র বেশি অস্ত্র কোন ভূমিকা রাখবে? এই প্রশ্নের উত্তর কারো কাছেই নেই — এমনকি রাষ্ট্রের নিজের কাছেও না।

ঝুঁকি ২: রাষ্ট্র নিজেই এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি, কী করবে

পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছিলাম, একই চিফ প্রসিকিউটর এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই বিপরীত অবস্থান নিয়েছেন — প্রথমে “ফিরে আসুন, আইনি বাধা নেই,” পরে “প্রত্যর্পণ ছাড়া সরাসরি ফেরার সুযোগ নেই।” বিএনপির নিজের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা আবার বলেছেন, “আইনগত অবশ্যই কোনো বাধা নেই।” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাইয়ে আরেক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “এত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার পরও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার আজও কোনো অনুশোচনা নেই” — একই সাথে সরকার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠিয়েছে।

অর্থাৎ, রাষ্ট্রের তিনটা ভিন্ন কণ্ঠ তিনটা ভিন্ন কথা বলছে — একজন বলছেন আসুন, একজন বলছেন আসার আইনি পথ নেই, একজন বলছেন আপনি ফিরলেই গ্রেপ্তার-বিচার। এই বিভ্রান্তি ছোট কোনো বিষয় না। ডিসেম্বরে যদি হাসিনা সত্যিই সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছান — ধরা যাক ভারতের নীরব সম্মতিতে — তাহলে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায়, কোন বাহিনীর হাতে, কোন আইনি কাঠামোয় তাকে গ্রহণ বা গ্রেপ্তার করা হবে, সেটা এখনো স্পষ্ট না। একটা রাষ্ট্র যখন নিজের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের প্রশ্নে নিজের ভেতরেই এক মত না, তখন সেই অনিশ্চয়তা নিজেই একটা ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।

ঝুঁকি ৩: নির্বাচনী সহিংসতা এখনো থামেনি — আর এটা প্রেক্ষাপটেরই অংশ

বাংলাদেশ সবেমাত্র ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পার করেছে, আর সেই নির্বাচনের আগে-পরের সময়টা শান্তিপূর্ণ ছিল না। আল জাজিরার একটা প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন — এর মধ্যে ৭ জানুয়ারি বিএনপির ছাত্র সংগঠনের কর্মী আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনাও আছে। বিএনপির ছাত্র সংগঠনের এক নেতা সরাসরি বলেছেন, “নির্বাচনের সময় সহিংসতা যেন অনিবার্য মনে হয়।”

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিজে বাংলাদেশে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যখন এক তরুণ আন্দোলন-নেতার হত্যাকাণ্ড নতুন করে অস্থিরতার জন্ম দেয়। জুনের শেষে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর (২৩ জুন) আগে সরকার সারা দেশে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করে — স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই জানান, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ওই সময়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে।

একটা সাধারণ পার্টি-বার্ষিকী ঘিরেই যদি রাষ্ট্রকে সেনাবাহিনী নামাতে হয়, তাহলে ডিসেম্বরে যদি সত্যিই একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী — যিনি এখনো দলের সবচেয়ে বড় প্রতীক — দেশে ফেরার প্রকৃত প্রচেষ্টা নেন, তার আশপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আনুপাতিকভাবে কতটা জটিল হতে পারে, সেটা অনুমান করা কঠিন কিছু না।

ঝুঁকি ৪: তৃণমূলের জমে থাকা ক্ষোভ — যা দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রথম দেখা গিয়েছিল

দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছিলাম, আওয়ামী লীগের ৭৭ জন কেন্দ্রীয় নেতার মধ্যে মাত্র ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, বাকিরা পলাতক — অথচ তৃণমূল পর্যায়ে হাজারে হাজারে সাধারণ কর্মী মামলার মুখে পড়েছেন। বিএনপির নিজের এক নেতা স্বীকার করেছেন, এই বৈষম্য থেকে আওয়ামী লীগের ভেতরে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে — “শীর্ষ নেতৃত্ব নিরাপদে পালিয়ে গেছে, সাধারণ কর্মীদের রেখে গেছে জনগণের ক্রোধের সামনে।”

একই অধ্যায়ে আমরা দেখেছিলাম, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়নি — গাজীপুরে প্রকাশ্য মহাসড়কে মিছিল, পুলিশকে সরাসরি হুমকি। এই দুটো তথ্য একসাথে পড়লে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয় — একদিকে ক্ষুব্ধ তৃণমূল, যাদের হারানোর তেমন কিছু নেই, অন্যদিকে একটা সংগঠন যেটা প্রকাশ্যে সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা এখনো দেখিয়েছে। শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ঘোষণা এই তৃণমূলের কাছে একটা প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে — নেতৃত্ব যদি সত্যিই ঝুঁকি নিয়ে ফেরার চেষ্টা করে, তাহলে তৃণমূলও পথে নামার একটা কারণ খুঁজে পেতে পারে। এটা একটা সম্ভাবনা, নিশ্চিত পরিণতি না — কিন্তু দ্বিতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত অসন্তোষের পটভূমিতে এই সম্ভাবনাকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।

ঝুঁকি ৫: শাসক জোটের নিজস্ব ফাটল — সংকটের মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ জবাব দেওয়ার সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ

চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা দেখিয়েছিলাম, বিএনপি-এনসিপি-জামায়াতের মধ্যেকার ঐক্য এখন প্রকাশ্যে ভেঙে পড়ছে — এনসিপির আহ্বায়ক নিজেই বিএনপি সরকারকে “গাদ্দারি” বলে আখ্যা দিয়েছেন, সাভারে এনসিপির পদযাত্রায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছে, যার জন্য এনসিপি-জামায়াত সরাসরি সরকারকে দায়ী করেছে।

একটা রাষ্ট্র যখন একটা বড় নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি হয় — যেমন ডিসেম্বরে হাসিনার প্রত্যাবর্তন-প্রচেষ্টা হতে পারে — তখন তার সবচেয়ে বেশি দরকার হয় সমন্বিত, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। কিন্তু ক্ষমতাসীন জোটের ভেতরেই যদি একে অপরকে “প্রতারক” বলার সংস্কৃতি বদ্ধমূল হয়ে যায়, তাহলে সংকটকালীন সমন্বয় স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে। এটা প্রত্যক্ষ কার্যকারণ না — কিন্তু একটা বাস্তবতা, যা সামনের মাসগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ঝুঁকি ৬: ভারতের নীরবতা দীর্ঘায়িত হলে কী হয়

পঞ্চম অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখানো হয়েছিল, ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধে এখনো কোনো স্পষ্ট জবাব দেয়নি — না সম্মতি, না প্রত্যাখ্যান। শেখ হাসিনা নিজে অবশ্য রয়টার্স ও এনডিটিভিকে বলেছেন, তিনি প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকতে চান না — নিজে থেকেই ফিরবেন। এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নিরাপত্তাগত প্রশ্ন তৈরি হয় — যদি ভারত সরকার তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে না আটকায়, আর তিনি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে সীমান্তের দিকে অগ্রসর হন, তাহলে সেটা একটা এমন পরিস্থিতি তৈরি করবে যেখানে দুই রাষ্ট্রের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়াটা নিয়ন্ত্রণ করছে না। একটা অনিয়ন্ত্রিত সীমান্ত-মুহূর্ত, যেখানে হাজারো সমর্থক জড়ো হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তা নিরাপত্তা পরিকল্পনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে জটিল দৃশ্যকল্পগুলোর একটা।

সম্ভাব্য দৃশ্যপট: চারটা পথ, কোনোটাই নিশ্চিত না

নিচের চারটা সম্ভাবনা ভবিষ্যদ্বাণী না — এগুলো এই মুহূর্ত পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তিসঙ্গতভাবে কল্পনাযোগ্য পথ। বাস্তবে কোনটা ঘটবে, বা আদৌ এর কোনোটা ঘটবে কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলার উপায় নেই।

সম্ভাবনা ১ — নিয়ন্ত্রিত আত্মসমর্পণ। ভারত ও বাংলাদেশ প্রকাশ্য ঘোষণা ছাড়াই কূটনৈতিকভাবে একটা প্রক্রিয়ায় সমঝোতায় পৌঁছায়, হাসিনা একটা নির্ধারিত সময়ে সীমান্ত পার হয়ে সরাসরি নিরাপত্তা হেফাজতে আদালতে হাজির হন। এই পথে সহিংসতার ঝুঁকি সবচেয়ে কম, কিন্তু এর জন্য দুই রাষ্ট্রের মধ্যে এমন সমন্বয় দরকার, যার কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে নেই।

সম্ভাবনা ২ — ফেরা বিলম্বিত বা কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত। ভারত তার বর্তমান নীরব অবস্থান বজায় রাখে, ডিসেম্বর পার হয়ে যায়, হাসিনা সময় পিছিয়ে দেন বা ঘোষণাটা রাজনৈতিক ভাষণেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় — যেমনটা অতীতে একাধিকবার তার “শিগগিরই দেখা হবে” ধরনের বক্তব্যে ঘটেছে বলে পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেছেন। এই পথে স্বল্পমেয়াদী ঝুঁকি কম, কিন্তু অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হয়, আর আওয়ামী লীগের ভেতরের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে।

সম্ভাবনা ৩ — প্রকাশ্য সংঘাত। হাসিনা বা তার ঘনিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রকৃতপক্ষে ফেরার চেষ্টা করেন, রাষ্ট্র তাকে গ্রেপ্তার করতে যায়, আর সেই মুহূর্তে ছাত্রলীগ বা তৃণমূল সমর্থকরা প্রকাশ্য জমায়েতের চেষ্টা করে, নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ হয় — এমন পরিস্থিতিতে সমাজে ভাসমান নিখোঁজ অস্ত্রের ভূমিকা নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। এই পথের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, আর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঝুঁকির প্রতিটা উপাদান — অস্ত্র, রাষ্ট্রীয় বিভ্রান্তি, নির্বাচনী সহিংসতার ধারাবাহিকতা — এই দৃশ্যকল্পেই সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

সম্ভাবনা ৪ — প্রতীকী ঘোষণা হিসেবেই থেকে যাওয়া। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, এই ঘোষণা মূলত দলীয় কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার একটা রাজনৈতিক কৌশল — বাস্তব পরিকল্পনা যতটা না, তার চেয়ে বেশি প্রতীক। এমনটা হলে, প্রকৃত সীমান্ত-অতিক্রমের চেষ্টা নাও হতে পারে, বরং ডিসেম্বর ঘিরে বিবৃতি, সমাবেশ ও রাজনৈতিক বাগযুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে পুরো ঘটনা।

কোন পথে বাংলাদেশ যাচ্ছে, সেটা এখনই বলা সম্ভব না — কারণ যেমনটা পঞ্চম অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে, রাষ্ট্র নিজেই এখনো সিদ্ধান্তহীন, আর হাসিনার প্রকৃত অভিপ্রায় নিয়েও তার নিজের দলের ভেতরে মতভেদ আছে।

সাধারণ মানুষের জন্য এর মানে কী

এই প্রতিবেদন শুরু হয়েছিল একটা প্রশ্ন দিয়ে — রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো কতটা মেরামত হয়েছে। ছয় অধ্যায় পরে উত্তরটা আরও স্পষ্ট। যে অস্ত্র থানা থেকে হারিয়েছে, তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তাতেও প্রভাব ফেলছে। যে বিচারিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনিশ্চিত, তার চূড়ান্ত মীমাংসা যেভাবেই হোক, সাধারণ মানুষের এলাকাতেই তার প্রভাব সবচেয়ে আগে পড়বে — নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে, দোকানপাটে, যাতায়াতে, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্তে। রাজনীতির এই অধ্যায় শুধু ঢাকার সংসদ ভবন বা দিল্লির কূটনৈতিক করিডোরে সীমাবদ্ধ থাকছে না — এটা প্রতিটা জেলা শহর, প্রতিটা মহল্লা পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা রাখে।


উপসংহার: ছয়টা অধ্যায় একসাথে যা বলছে

আইনশৃঙ্খলার শূন্যতা, প্রতিহিংসার অসামঞ্জস্য, নতুন নেতৃত্বের অসম্পূর্ণ জবাবদিহি, শাসক জোটের ভাঙন, আর একজন সাবেক শাসকের অনিশ্চিত প্রত্যাবর্তন-ঘোষণা — এই পাঁচটা সুতো একসাথে বুনলে যে ছবিটা ফুটে ওঠে, তা কোনো একক দলের বা একক ব্যক্তির গল্প না। এটা একটা রাষ্ট্রের গল্প, যে রাষ্ট্র একটা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুরনো কাঠামো ভেঙেছে, কিন্তু নতুন কাঠামো এখনো পুরোপুরি দাঁড় করাতে পারেনি। ডিসেম্বর একটা পরীক্ষা হতে পারে — এই অসম্পূর্ণ রূপান্তর আসলে কতটা টেকসই, সেই পরীক্ষা।


সংশোধনী নীতি

এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত যেকোনো তথ্যগত ভুল বা অসম্পূর্ণতা প্রমাণসহ চিহ্নিত করা হলে বেঙ্গল গেজেট তা যাচাই করে যথাযথ সংশোধনী প্রকাশ করবে। যেকোনো উল্লেখিত পক্ষ বা ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য সম্পাদকীয় দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এই প্রতিবেদনে “সম্ভাবনা” শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, “ভবিষ্যদ্বাণী” শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি — কোনো সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া সম্ভব না। সহিংসতা বা অস্থিরতা সংক্রান্ত আলোচনা এখানে বিশ্লেষণাত্মক উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে, কোনো পক্ষকে উসকানি দেওয়ার উদ্দেশ্যে না — এবং কোনো ধরনের সহিংসতাকে এই প্রতিবেদন বৈধতা দেয় না।


তথ্যসূত্র

অধ্যায় ১: পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান (বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক ইনকিলাব, প্রথম আলো, আজকের পত্রিকা); বানিয়াচং ঘটনা (প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, ইত্তেফাক — জানুয়ারি ২০২৬); ভালুকা ঘটনা (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দেশ রূপান্তর, প্রথম আলো, বাংলাদেশের খবর — ডিসেম্বর ২০২৫); উখিয়া ঘটনা (যুগান্তর — মে ২০২৬)।

অধ্যায় ২: মামলার পরিসংখ্যান ও তুলনা (বাংলা ট্রিবিউন — এপ্রিল ২০২৬); স্থানীয় মামলার সংখ্যা (আজকের পত্রিকা, দৈনিক ইনকিলাব, ইত্তেফাক, বাংলাদেশ প্রতিদিন, প্রথম আলো — জুন-জুলাই ২০২৬); কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তার পরিসংখ্যান ও আলালের বক্তব্য (বণিক বার্তা, যুগান্তর); গাজীপুর মিছিল (দৈনিক ইনকিলাব, খবর সংযোগ, কুমিল্লার ডাক, জনতার আওয়াজ, প্রথম আলো — জুন-জুলাই ২০২৬)।

অধ্যায় ৩: হলফনামা তথ্য (Business Standard, BSS, খবর সংযোগ, বাংলাদেশ প্রতিদিন — ডিসেম্বর ২০২৫-জানুয়ারি ২০২৬); হাসনাত আবদুল্লাহর গাড়ি বিতর্ক (যুগান্তর, ইত্তেফাক, প্রথম আলো, দৈনিক ইনকিলাব — এপ্রিল ২০২৬); আসিফ মাহমুদের চাঁদাবাজি অভিযোগ (প্রথম আলো, bdnews24, কালের কণ্ঠ — আগস্ট ২০২৫); অস্ত্র বিতর্ক (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, প্রথম আলো, ইত্তেফাক, যুগান্তর — জুন ২০২৫); বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ (বাংলাভিশন “ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন” অনুষ্ঠান); আসিফ নজরুলের মন্তব্য (মুক্তমঞ্চ); হান্নান মাসউদ ধানমন্ডি ঘটনা (সময়ের আলো, এনসিপির নিজস্ব বিজ্ঞপ্তি — মে ২০২৫)।

অধ্যায় ৪: এনসিপি-বিএনপি উত্তেজনা ও ককটেল বিস্ফোরণ (দেশ রূপান্তর, বাংলা ট্রিবিউন — জুলাই ২০২৬); জামায়াত-এনসিপি বিরোধ (বাংলানিউজ২৪ — অক্টোবর ২০২৫); মার্কিন স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠান বিতর্ক (দৈনিক ভোরের ডাক, ব্যানার নিউজ, কালবেলা, যুগান্তর, মিরর টাইমস বিডি, রেডিও টুডে, বাংলা ট্রিবিউন — জুলাই ২০২৬); মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বিতর্ক (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, প্রথম আলো — ফেব্রুয়ারি-মে ২০২৬)।

অধ্যায় ৫: রয়টার্স সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়া (যুগান্তর, আইটিভি বিডি — জুলাই ২০২৬); চিফ প্রসিকিউটরের স্ববিরোধী বক্তব্য (দ্য ওয়াল, ইত্তেফাক, কালবেলা, ভিউজ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কণ্ঠ, আজকের বাংলাদেশ, দৈনিক ইনকিলাব — জুলাই ২০২৬); স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য (প্রথম আলো, জাগো নিউজ — মে-জুলাই ২০২৬); রুমিন ফারহানার বক্তব্য (খবরের কাগজ, ইত্তেফাক, কালবেলা, দেশ রূপান্তর, রাইজিংবিডি, দৈনিক ইনকিলাব — জুলাই ২০২৬); আইসিটি আইন ও প্রত্যর্পণ চুক্তি বিশ্লেষণ (দৈনিক ইনকিলাব, জুরিস্টিকো); ২০০৭ সালের ইতিহাস (বাংলা উইকিপিডিয়া, ইত্তেফাক আর্কাইভ, পেজফোরনিউজ); সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য (ইত্তেফাক, যুগান্তর — ফেব্রুয়ারি-জুন ২০২৬)।

অধ্যায় ৬: অস্ত্র উদ্ধার পরিসংখ্যান (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য উইক/পিটিআই, দ্য ডেইলি পাইওনিয়ার — জানুয়ারি ২০২৬); নির্বাচনী সহিংসতা (আল জাজিরা — জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০২৬); জাতিসংঘের বিবৃতি (ইউএন নিউজ — ডিসেম্বর ২০২৫); আওয়ামী লীগ বার্ষিকী ঘিরে নিরাপত্তা প্রস্তুতি (ইন্ডিয়া টিভি নিউজ, ইউএস নিউজ/রয়টার্স — জুন ২০২৬); শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ঘোষণা ও প্রতিক্রিয়া (রয়টার্স, আল জাজিরা, প্রথম আলো, দ্য উইক, এনডিটিভি-ভিত্তিক প্রতিবেদন, দ্য ফেডারেল — জুলাই ২০২৬)।


পদ্ধতি ও সততা নোট: এই প্রতিবেদন সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন, প্রকাশ্য সরকারি নথি, নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামা, এবং স্বীকৃত বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বক্তব্যের ভিত্তিতে সংকলিত। যেখানে অভিযোগ অপ্রমাণিত, তা স্পষ্টভাবে “অভিযোগ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে সম্ভব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা দলকে টার্গেট করা না, বরং ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের প্রকৃত চিত্র নথিভুক্ত করা — সব পক্ষের জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করে।

বেঙ্গল গেজেট — এশিয়ার প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্রের (১৭৮০) ঐতিহ্যে।