Politicsজেন-জি আন্দোলন 📍 India

জুলাইয়ের চিত্রনাট্য: ঢাকার পুরনো নাটক কি এবার দিল্লির মঞ্চে?

দুই বছর, একই মাস, প্রায় একই দৃশ্য — ২০২৪-এর ঢাকা আর ২০২৬-এর দিল্লি পাশাপাশি রাখলে যে প্যাটার্ন ভেসে ওঠে, সেটাই এই অনুসন্ধানের প্রথম পর্ব। ইউনূস, ট্রাম্প, হাসিনার নিজের মুখের স্বীকারোক্তি বনাম ভারতের এখনো-খালি ফাইল — সত্য আর তত্ত্বের সীমারেখা টেনে।

একই মাস, একই দৃশ্যপট, নতুন কুশীলব — উপমহাদেশের বৃহত্তম গণতন্ত্রেও কি এই নাটকের পর্দা উঠে গেছে?

"THE JULY SCRIPT…"

একটি তুলনামূলক অনুসন্ধান — পর্ব ১: ভারত ও একই চিত্রনাট্যের ছায়া


একটা মেয়ে, যে মঞ্চ ছাড়েনি

সোনা বিষ্ট নামের ২০ বছর বয়সী মেয়েটা যখন জানতার মন্তরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল, তার শরীরে তখনো আগের দিনের লাঠির দাগ শুকায়নি। রাষ্ট্র ভেবেছিল একবার পিটিয়ে দিলেই এই ছেলেমেয়েগুলো মঞ্চ ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু সোনা আর তার বন্ধুরা পরদিন আবার ফিরে এলো, একই জায়গায়, একই ক্যাম্পে। সে শুধু বলল — সরকার যদি ভাবে জেন-জির সঙ্গে এভাবে করলে আমরা থেমে যাব, সেটা হবে না।

তারিখটা ছিল ২১ জুলাই, ২০২৬।

এই একটা তারিখেই আসলে গোটা চিত্রনাট্যটা লুকিয়ে আছে। কারণ ঠিক দুই বছর আগে, একই মাসে, উপমহাদেশের আরেকটা রাজধানীতে, প্রায় একই বয়সী আরেকদল তরুণ-তরুণী, একই রকম জেদ নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, একই রকম লাঠি খেয়েছিল, একই রকম “আমরা থামব না” বলেছিল। সেই রাজধানীর নাম ছিল ঢাকা। প্রশ্ন হলো — এটা কি একই নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক, নাকি নিছক দুটো আলাদা গল্প, যাদের মধ্যে শুধু মাসটাই মিলে গেছে?

দুই রাজধানী, একই চিত্রনাট্য — কুশীলব শুধু পাল্টায়

উপমহাদেশের রাজনীতিতে একটা পুরনো কথা আছে — ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে না, কিন্তু ছন্দ মিলিয়ে চলে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের মঞ্চে প্রথম যে দৃশ্যটা নামে, সেটা সরকারি চাকরিতে কোটা-সংস্কারের দাবি নিয়ে। ৬ জুন থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে মোড় নেয়, যখন শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের “রাজাকারের নাতি-নাতনি” বলে সম্বোধন করেন। এই একটা সংলাপই যেন পুরো নাটকের ক্লাইম্যাক্স টেনে আনে — সারা দেশে স্লোগানের আগুন। ৩ আগস্ট নাগাদ দাবি নেমে আসে একটাই বিন্দুতে — প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ। ৫ আগস্ট, পনেরো বছরের শাসনের যবনিকা।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে দিল্লির মঞ্চে প্রথম দৃশ্যটা নামে আরও ছোট একটা সংলাপ থেকে — প্রধান বিচারপতির মুখে “তেলাপোকা” শব্দটা। মে মাসে জন্ম নেওয়া একটা ব্যঙ্গ-চরিত্র, জুলাইয়ে এসে হঠাৎ প্রধান কুশীলব হয়ে ওঠে, সংসদ ভবনের দিকে মিছিল নিয়ে যায়, পুলিশের লাঠি খায়, আর তারপর মঞ্চে ঢোকেন দ্বিতীয় বড় চরিত্র — বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, নিজে হাতে জিপ-টাই বেঁধে।

দুই নাটকের মাঝে দুই বছরের ব্যবধান। কিন্তু চিত্রনাট্যের কাঠামো প্রায় হুবহু এক — একটা তুচ্ছ সংলাপ থেকে সূত্রপাত, তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ, সোশ্যাল মিডিয়ার গতি, রাষ্ট্রীয় দমন যা আগুনে ঘি ঢালে, আর শেষ অঙ্কে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির প্রবেশ। প্রশ্নটা তাই আর “কী ঘটল” না — প্রশ্নটা হলো, এই চিত্রনাট্য কি কারো লেখা, নাকি ইতিহাস নিজে নিজেই একই ছন্দে হাঁটে?

নেপথ্যে যারা থাকে, তারা কখনো ভুল করে সামনে চলে আসে

প্রতিটা বড় নাটকের একটা নিয়ম আছে — মঞ্চের পেছনের কারিগররা সহজে ধরা দেয় না। কিন্তু মাঝেমধ্যে, উৎসবের আনন্দে বা অহংকারের ভারে, তারা নিজেই পর্দা সরিয়ে ফেলে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে, বিল ক্লিনটনের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে, মুহাম্মদ ইউনূস নিজের মুখে বলেন — বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন ছিল “অত্যন্ত সুপরিকল্পিত”। এতটাই সুপরিকল্পিত যে এর নেতৃত্ব-কাঠামো কেউ চিহ্নিত করে থামাতে পারবে না, নিজের ভাষায়। এই ভিডিও আজও ইন্টারনেটে আছে। এটা কোনো অভিযোগ না — এটা মঞ্চের কারিগরের নিজের মুখের স্বীকারোক্তি, ক্যামেরার সামনে, করতালির মধ্যে।

কয়েক মাস পর, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা দেন — USAID-এর ২৯ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে গিয়েছিল “র‍্যাডিক্যাল বামপন্থীদের” ভোট আদায়ে সহায়তা করতে। বাংলাদেশ সরকার নিজেই স্বীকার করে “Strengthening Political Landscape” নামের এই প্রকল্প সত্যিই ছিল, ২০১৭ থেকে চলমান, মার্কিন সংস্থা Democracy International-এর হাতে বাস্তবায়িত।

এখানে একটু থামা দরকার — কারণ প্রতিটা চিত্রনাট্যে একটা কাউন্টার-সংলাপও থাকে। বাংলাদেশের নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার নিজেই বলেছেন, এই অর্থায়ন ক্ষমতা পরিবর্তন ঘটিয়েছে — এই দাবির কোনো ভিত্তি নেই, কারণ এই কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি সব দলের তৃণমূল কর্মীই অংশ নিয়েছিলেন। টাকা ছিল, প্রকল্প ছিল, কিন্তু “টাকাই সরকার ফেলেছে” — এই সরল অঙ্কটা কেউ প্রমাণ করতে পারেননি। নাটকে ভিলেন খোঁজা সহজ, কিন্তু প্রতিটা ষড়যন্ত্র-তত্ত্বই সত্যি হয় না।

তবু আরেকটা সংলাপ থেকে যায় কানে বাজতে — একই মাসে, মোদির পাশে দাঁড়িয়ে, এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমাদের ডিপ স্টেটের কোনো ভূমিকা ছিল না… আমি এটা প্রধানমন্ত্রী মোদির হাতে ছেড়ে দেব।” একজন প্রেসিডেন্টের মুখে “ডিপ স্টেট” শব্দটা অস্বীকারের ভঙ্গিতে আসা — এই একটা সংলাপই নিজে একটা প্রশ্ন তৈরি করে দেয়, যেটার উত্তর কেউ দেয় না, শুধু প্রশ্নটা ঝুলে থাকে।

আর নাটকের প্রতিপক্ষ চরিত্রের নিজের সংলাপ — শেখ হাসিনার অসম্পূর্ণ ভাষণ, যা তিনি দিতে পারেননি ৫ আগস্টের আগে দেশ ছাড়ার তাড়ায়। তাতে লেখা ছিল, সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দিলে তিনি ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। হোয়াইট হাউস তখনই এই সংলাপকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে খারিজ করে দেয়।

আর সবশেষে, মঞ্চের সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দৃশ্য — ২০২৬ সালের ৪ জুলাই, খোদ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে, মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যৌথভাবে জন্ম নেয় দশ সদস্যের “Caucus of America in the National Parliament of Bangladesh”। বাংলাদেশেরই বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন — এই ককাস কার স্বার্থ রক্ষা করতে দাঁড় করানো হলো?

ছয়টা সংলাপ, ছয়টা ভিন্ন কণ্ঠ — নোবেলজয়ী, প্রেসিডেন্ট, সরকারি কর্মকর্তা, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী, একদল সংসদ সদস্য। কেউ একসাথে বসে চিত্রনাট্য লেখেননি। তবু পাশাপাশি রাখলে একটা দৃশ্যপট ভেসে ওঠে, যেটা কাউকে অস্বস্তিতে না ফেলে পারে না।

দিল্লির মঞ্চে এখনো যে দৃশ্যটা নামেনি

এবার একই মাপকাঠিতে দিল্লিকে দাঁড় করানো যাক। সৎভাবে বলতে হয় — এখনো কিছু নামেনি এই মঞ্চে। অভিজিৎ দিপকের আন্দোলনের জন্ম একটা দেশীয় বিচারপতির মন্তব্য থেকে, তার বিস্তার একটা অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা-দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভ থেকে। কোনো নেপথ্যের কারিগর নিজে মুখ খোলেননি, কোনো অর্থায়নের ফাইল খোলেনি, কোনো ককাসের ঘোষণা আসেনি — অন্তত এখন পর্যন্ত যতটুকু আলোয় এসেছে, ততটুকুতে।

আর এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটা লুকিয়ে — বাংলাদেশেও তো প্রথম দুই সপ্তাহে কেউ কোনো ফাইল দেখেনি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকার রাস্তায় যখন প্রথম রক্ত ঝরেছিল, তখন কেউ জানত না নিউইয়র্কের কোন মঞ্চে কোন স্বীকারোক্তি অপেক্ষা করছে, বা হোয়াইট হাউসের কোন ব্রিফিং রুমে কোন সংখ্যা উচ্চারিত হবে। সেই সংলাপগুলো লেখা হয়েছিল পরে, মাস গড়িয়ে, বছর পেরিয়ে।

তাহলে প্রশ্নটা দাঁড়ায় এভাবে — দিল্লির মঞ্চ কি সত্যিই খালি, নাকি এটা শুধু ঢাকার নাটকের চেয়ে দুই বছর কম বয়সী একটা অঙ্ক, যার সংলাপ এখনো লেখা হচ্ছে পর্দার আড়ালে?

খেলা কি আবার হবে?

বাংলার রাজনীতিতে একটা স্লোগান বহুবার শোনা গেছে — “খেলা হবে।” প্রশ্নটা তাই এভাবেও করা যায় — এই খেলাটা কি আবার হবে, এবার আরও বড় মাঠে, আরও বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে?

ধরুন, আজ থেকে ঠিক এক বছর পর কেউ একটা আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলল, এই আন্দোলনও ছিল “meticulously designed”। ধরুন, কোনো এক শুনানিতে একটা “সক্ষমতা-বৃদ্ধি” প্রকল্পের নাম উঠে এলো, যার টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠল। ধরুন, সংসদে আরেকটা নতুন “বন্ধুত্ব-ককাস” জন্ম নিল, কোনো একটা দূতাবাসের সঙ্গে যৌথভাবে। সেদিন কি আমরা চমকে উঠব? নাকি বলব — “আরেহ, এটা তো হওয়ারই ছিল, জুলাইয়েই তো বীজ বোনা হয়েছিল”?

ভারতের প্রতিষ্ঠান অবশ্য বাংলাদেশ-নেপাল-শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভিন্ন গল্প বলতে পারে — দীর্ঘ-প্রতিষ্ঠিত বহুদলীয় সংসদীয় কাঠামো, একটা সেনাবাহিনী যা কখনো ক্ষমতা-পরিবর্তনের নাটকে অভিনয় করেনি, একটা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা যা এখনো অটুট। রাহুল গান্ধীর রাস্তায় নামাও নতুন দৃশ্য না — ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনেও একই কুশীলব একই ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল, আর সেই নাটক সরকার ফেলেনি।

কিন্তু ইতিহাস আমাদের এটাও শিখিয়েছে — চিত্রনাট্য ঠিক তখনই ভাঙে, যখন দর্শক ভাবে এবার ভাঙবে না। আর ক্যালেন্ডার, অন্তত এ পর্যন্ত, উপমহাদেশের তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভের জন্য জুলাই মাসটাকেই বারবার মঞ্চ হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

পর্দা এখনো নামেনি। আমরা তাই প্রশ্নটা খোলাই রাখছি, উত্তর না দিয়ে — কারণ এই নাটকের শেষ দৃশ্য এখনো ইতিহাস লিখছে, আমরা না।


পরবর্তী পর্বে: একই চিত্রনাট্য নিয়ে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মঞ্চ ঘাঁটব — সেখানেও কি জুলাই-আগস্টের ছন্দ মেলে? আর পাকিস্তানের বেলুচিস্তান সংকট, যা ভিন্ন ধরনের নাটক হলেও একই সময়ে গোটা অঞ্চলের অস্থিরতার বৃহত্তর মঞ্চের অংশ।

সূত্র: NPR, CNN, Al Jazeera, Bloomberg, PBS NewsHour, The Business Standard, bdnews24, Global Times, Gulf News, The Diplomat, Democracy International (democracyinternational.com), Daily Sun, Wikipedia (July Uprising, Cockroach Janta Party)।


[সম্পাদকীয় দল নোট: প্রতিটি তথ্য সোর্স-যাচাইকৃত। “চিত্রনাট্য”, “মঞ্চ”, “কুশীলব” ইত্যাদি রূপক ব্যবহার করা হয়েছে পাঠকের সঙ্গে সংযোগ তৈরির জন্য — এগুলো সাহিত্যিক উপকরণ, প্রতিটি তথ্যের ভিত্তি এখনো সোর্স-নির্ভর ও যাচাইকৃত, রূপক দিয়ে কোনো অপ্রমাণিত দাবিকে সত্য হিসেবে না বসিয়ে।

Share: X / Twitter Facebook LinkedIn