শিল্পাঞ্চলের অর্থনৈতিক ক্যান্সার: সাভার-আশুলিয়ায় অনিবন্ধিত সুদি কারবারের বিস্তার
সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে “সমবায় সমিতি” পরিচয়ে চলা অনিবন্ধিত সুদি কারবারের আইনি কাঠামো, সাম্প্রতিক হাইকোর্ট নির্দেশনা ও কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে Bengal Gazette-এর অনুসন্ধানী সিরিজের প্রথম প্রতিবেদন।
সাভার-আশুলিয়ার বাজারে বাজারে, অলিগলিতে ছোট ছোট অফিস। দেয়ালে টাঙানো “সমবায় সমিতি” লেখা সাইনবোর্ড, ভেতরে খাতা-কলমে হিসাব। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ সঞ্চয়-ঋণদান প্রতিষ্ঠান মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল এলাকাগুলোতে এই দৃশ্য এখন একটি বৃহত্তর, স্বীকৃত সমস্যার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে — নিয়ন্ত্রণহীন, উচ্চ সুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণদান ব্যবসা, যা প্রায়শই “সমবায় সমিতি” বা “ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান”-এর পরিচয়ে পরিচালিত হয়।
Bengal Gazette-এর ধারাবাহিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এই প্রতিবেদনে আমরা দেখছি এই সমস্যার আইনি কাঠামো, সাম্প্রতিক বিচারিক হস্তক্ষেপ, এবং শিল্পাঞ্চল এলাকায় এর বাস্তব প্রভাব।
সমস্যার প্রকৃতি
সাভার ও আশুলিয়া বাংলাদেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি, যেখানে লক্ষাধিক গার্মেন্টস শ্রমিক ও নিম্ন-আয়ের পরিবার বসবাস করে। এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতার বাইরে — জামানত না থাকা, আনুষ্ঠানিক আয়ের প্রমাণ না থাকা, বা জটিল কাগজপত্রের প্রক্রিয়ার কারণে তারা ব্যাংক ঋণ পান না। এই ফাঁক পূরণ করতে এগিয়ে আসে অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতারা, যাদের একটি অংশ বৈধ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু আরেকটি অংশ কোনো তদারকি ছাড়াই কাজ চালিয়ে যায়।
স্থানীয় বাজারগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় ছোট অফিস, যেখানে “সমবায় সমিতি” পরিচয়ে ঋণ কার্যক্রম চলে, কিন্তু প্রকৃত নিবন্ধন যাচাই করা কঠিন — সাইনবোর্ডের সার্টিফিকেট অস্পষ্ট থাকে, নিবন্ধন নম্বর প্রকাশ্যে উল্লেখ থাকে না, এবং গ্রাহকদের কাছে এই তথ্য যাচাই করার কোনো সহজ উপায় থাকে না।
আইনি কাঠামো: কে ঋণ দিতে পারে, কত সুদে
বাংলাদেশে কে ঋণ দিতে পারবে এবং কী হারে সুদ নিতে পারবে তা আইন দ্বারা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। সমবায় সমিতি আইন, ২০০১-এর ধারা ২৬-এ সমবায় সমিতির আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বাধানিষেধ আরোপ করা আছে — একটি সমবায় সমিতি তার নিবন্ধিত উপ-আইন (bye-laws) ও অনুমোদিত কার্যপরিধির বাইরে গিয়ে ঋণ কার্যক্রম চালাতে পারে না। এর বাইরে, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, যেকোনো প্রতিষ্ঠান যদি সাধারণ মানুষের কাছে নিয়মিতভাবে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করতে চায়, তাহলে তাকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (MRA)-এর পৃথক লাইসেন্স নিতে হয় — শুধু সমবায় নিবন্ধন যথেষ্ট নয়।
সুদের হারের ক্ষেত্রেও সীমা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকা তফসিলি ব্যাংকগুলোতে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অন্যান্য ঋণে বর্তমানে বার্ষিক সর্বোচ্চ সুদ হার ৯ শতাংশের মধ্যে বেঁধে দেওয়া আছে। অথচ অনানুষ্ঠানিক সুদ কারবারিরা প্রায়ই মাসে ১০ শতাংশ বা তারও বেশি হারে সুদ আদায় করেন — যা বার্ষিক হিসেবে ব্যাংকের নির্ধারিত হারের বহুগুণ। এই বিশাল ব্যবধানই মূলত সুদ কারবারিদের ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখে, কারণ যাদের কাছে ব্যাংকের বিকল্প নেই, তারা বাধ্য হয়ে এই উচ্চ সুদেই ঋণ নেন।
সাম্প্রতিক বিচারিক হস্তক্ষেপ
এই সমস্যা সম্প্রতি জাতীয় পর্যায়ে বিচারিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একটি জাতীয় দৈনিকে “চড়া সুদে ঋণের জালে কৃষকেরা” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে একজন ব্যারিস্টার হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন, যাতে অনিবন্ধিত সুদ কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নির্দেশনা দেয়:
- সারাদেশে অনিবন্ধিত ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সমবায় সমিতির তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
- তালিকা তৈরির সময় কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে সেই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে কার্যক্রম বন্ধেরও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত
- ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (MRA)-কে স্থানীয় পর্যায়ের সুদ কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
- বাংলাদেশ ব্যাংককে অননুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদন্তে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
- আদালতের নির্দেশ প্রতিপালন করে ৪৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
এই নির্দেশনা ইঙ্গিত দেয় যে সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন কোনো এলাকার ঘটনা নয়, বরং একটি জাতীয় পর্যায়ের কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃত হয়েছে।
ভুয়া সমিতির প্রতারণা: একটি পরিচিত প্যাটার্ন
শুধু অননুমোদিত সুদ ব্যবসাই নয়, “সমবায় সমিতি” পরিচয় ব্যবহার করে সরাসরি প্রতারণার ঘটনাও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নথিভুক্ত হয়েছে। যেমন, কক্সবাজারের উখিয়ায় “প্রত্যাশা সমিতি” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল যে তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অগ্রিম জামানত হিসেবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করত — নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দিলে তার বিপরীতে বহুগুণ বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হতো। স্থানীয়দের অনেকে জানিয়েছিলেন, সমিতির কার্যক্রম নিয়ে আগে থেকেই সন্দেহ ছিল।
এই প্যাটার্ন — অস্পষ্ট নিবন্ধন, যাচাই-অযোগ্য সার্টিফিকেট, মুখে মুখে প্রচারিত বিশ্বাসযোগ্যতা, এবং তদারকির অভাব — দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বারবার ফিরে আসতে দেখা গেছে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতের বিশালতা ও তদারকির চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে বৈধ ক্ষুদ্রঋণ খাত অত্যন্ত বিশাল — বর্তমানে প্রায় ৭২৪টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকার ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই বিশালতাই তদারকিকে জটিল করে তোলে — হাজার হাজার ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রকৃত নিবন্ধিত ও অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান আলাদা করে চেনা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন, এবং স্থানীয় প্রশাসনের সীমিত জনবল দিয়ে প্রতিটি বাজার-এলাকার প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পরিদর্শন করাও বাস্তবে চ্যালেঞ্জিং।
কেন এই ফাঁক এত দিন টিকে থাকে
কয়েকটি কাঠামোগত কারণে এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকে বলে প্রতীয়মান হয়:
যাচাইয়ের অভাব: সাধারণ গ্রাহকের কাছে কোনো প্রতিষ্ঠান সমবায় অধিদপ্তরে নিবন্ধিত কি না, বা MRA-অনুমোদিত কি না — তা যাচাই করার সহজ, সহজলভ্য উপায় নেই।
বিকল্পের অভাব: ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষের জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত ঋণ পাওয়ার আর কোনো উপায় না থাকায় তারা ঝুঁকি জেনেও উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন।
অভিযোগ করার সংকোচ: স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে অনেক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে দ্বিধাবোধ করেন।
তদারকির সীমাবদ্ধতা: স্থানীয় পর্যায়ে জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিটি এলাকার প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে পরিদর্শন করা প্রশাসনের পক্ষে কঠিন।
এই সিরিজের পরবর্তী অংশ
Bengal Gazette এই বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখছে। শিল্পাঞ্চল এলাকায় নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে সংগৃহীত তথ্য যাচাই-বাছাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের পর, এই সিরিজের পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া ও নির্দিষ্ট কেস-স্টাডি প্রকাশ করা হবে।
এই প্রতিবেদনটি প্রাথমিক প্রেক্ষাপট নিবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এতে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। যদি আপনার কাছে এই বিষয়ে তথ্য থাকে, নিরাপদে যোগাযোগ করতে পারেন আমাদের সিকিউর টিপ চ্যানেলে।
সূত্র:
- সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ (সংশোধিত), ধারা ২৬
- ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৬
- হাইকোর্ট নির্দেশনা, অনিবন্ধিত সুদ কারবারি সংক্রান্ত রিট মামলা
- দৈনিক জনকণ্ঠ, “উখিয়ায় প্রত্যাশা সমিতির নামে প্রতারণা” প্রতিবেদন
- প্রথম আলো, ক্ষুদ্রঋণ খাত সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রতিবেদন
সংশোধনী নীতি: অনুসন্ধান এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এই সিরিজ হালনাগাদ হবে। তথ্যগত ভুল থাকলে জানান — right to reply ট্র্যাকার বা সম্পাদকীয় ইমেইলে।
© 2026 Bengal Gazette. (England & Wales)
All rights reserved. No part of this report may be reproduced, redistributed, or commercially used without prior written permission. Brief quotation with attribution and a link is permitted under fair dealing.
Licensing inquiries: licensing@bengalgazette.asia
