BELA ও রিজওয়ানা — তারা কি আদৌ পরিবেশের রক্ষক?
২৭ বছর একই নেতৃত্ব, একই সাত সদস্যের কমিটি, দাতাদের কোটি টাকা — অথচ যে মামলা BELA-কে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি দিয়েছিল, সেই মামলাতেই কোনো সমাধান নেই। Bengal Gazette এখন BELA, রিজওয়ানা হাসান ও ছয়টা দাতা সংস্থার কাছে সরাসরি জবাব চাইছে।
— একটি পরিবেশবাদী অলাভজনক সংগঠন ও তার শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তির ক্রমাগত নীতিগত দ্বন্দ্ব ও দাতাসংস্থার কয়েকশো কোটি টাকার জবাবদিহিতাবিহীন ২৭ বছর
By Abeer Uz Zaman, Editor-in-Chief
একই মামলা, একই নেতৃত্ব, চব্বিশ বছর। দাতাদের কোটি টাকা, অথচ ফলাফলের হিসাব নেই। Bengal Gazette-এর মধুমতি অনুসন্ধানের পাশাপাশি — এবার প্রশ্ন সেই সংস্থার দিকে, যে সংস্থা নিজেকে পরিবেশের রক্ষক দাবি করে।
একটা পুরনো কৌতুক আছে বাংলাদেশের আইনজীবী মহলে। বাবা এক নামকরা উকিল, ছেলে সদ্য পাস করা। বাবা বাইরে যাওয়ার আগে ছেলেকে বলে যান, তার বিশ বছরের একটা পুরনো মামলা আছে, আজ শুধু একটা নতুন তারিখ নিয়ে এসো। ছেলে ফিরে এসে গর্ব করে বলে, বাবা, আমি প্রথম দিনেই মামলাটা জিতিয়ে শেষ করে দিয়েছি! বাবা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন — “ওই একটা মামলার ফি দিয়েই তো তোকে মানুষ করেছি, আজ তুই সেই আয়ের উৎসটাই বন্ধ করে দিলি!”
মানুষ এই কৌতুকে হাসে, কারণ এটা একটা চেনা সত্যকে ছোঁয় — একটা পেশায়, একটা মামলা টিকে থাকাই কখনো কখনো তার সমাধান হওয়ার চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। প্রশ্নটা হলো: বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশ মামলাগুলোর একটার ক্ষেত্রে — একই সংস্থা, একই নেতৃত্বের অধীনে চব্বিশ বছর ধরে চলা, দাতাদের কোটি টাকার উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা মামলায় — এই একই প্রশ্ন কি ন্যায্যভাবে তোলা যায় না?
একজন মানুষ, তিনটা ভূমিকা
২০০৪ সালে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, তখন BELA-র প্রধান নির্বাহী, মধুমতি মডেল টাউনের বিরুদ্ধে রিট করেন। ২০১৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তিনিই সেই মামলার বাস্তবায়ন তদারক করেন — একই পদে। ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি সরকারের পরিবেশ, পরে পানিসম্পদ, পরে তথ্য ও সম্প্রচার — তিনটা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হন। অর্থাৎ, যে মামলা তিনি নিজে দায়ের করেছিলেন, তার বাস্তবায়নের দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত তার নিজের হাতেই এসে পড়ে।
কোনো পর্যায়ে — বাদী, তদারককারী, নীতিনির্ধারক — এই তিনটা ভূমিকার মধ্যে কোনো স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের দূরত্ব ছিল না। এটা কোনো অন্যায়ের প্রমাণ না। কিন্তু এটা একটা কাঠামোগত সত্য, এবং কাঠামোগত সত্যগুলো নিজে থেকেই প্রশ্ন তৈরি করে।
একই সাতজন, বছরের পর বছর
BELA-র ২০২০-২১ সালের নির্বাহী কমিটি ছিল সাতজনের — মির্জা কামরুল হাসান (চেয়ারম্যান), সুমাইয়া খায়ের (কোষাধ্যক্ষ), রোকসানা খন্দকার, খলিলুর রহমান, সাদিয়া রওশন জাহান, খন্দকার শামসুদ্দিন মাহমুদ, বাহরিন খান। BELA-র নিজস্ব ওয়েবসাইটে এখন, ২০২৬ সালে, একই সাতটা নাম — একই পদে — দেখা যায় (belabangla.org)। পাঁচ বছরে একটাও আসন বদলায়নি। শুধু তিনজন নতুন যোগ হয়েছেন, তার মধ্যে একজন তসলিমা ইসলাম, রিজওয়ানার জায়গায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী হিসেবে।
কমিটি ঠিক কীভাবে নির্বাচিত হয় — প্রতিযোগিতামূলক ভোটে, নাকি প্রথাগত অনুমোদনে — BELA-র নিজস্ব নিয়মাবলীতে যা লেখা আছে, তা আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে জানি না। ২০২০ সালের বার্ষিক সাধারণ সভার নথিতে শুধু লেখা: কমিটি “সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত।” প্রতিযোগিতা ছিল কিনা, সেটা নথিতে নেই।
দাতার টাকা — যা জানা যায়, যা জানা যায় না
BELA-র নিজস্ব বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু ২০১৯-২০ সময়কালেই অন্তত ছয়টা দাতা সক্রিয় ছিল — সুইডেন দূতাবাস/Sida (মূল, দীর্ঘমেয়াদী অনুদান), জার্মান সরকার (“Citizens Move to Protect Urban Wetlands” — ঠিক সাভার এলাকায়), Oxfam, Friends of the Earth International, ISVARA Foundation, Inter Pares। প্রতিটার সুনির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক, ব্যয়ের খাত, ও তার ফলাফলের নথি এখনও প্রকাশ্য না — Bengal Gazette প্রতিটা দাতার কাছে সেই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়েছে, সুইডেনের Offentlighetsprincipen (তথ্য প্রকাশ নীতি) সহ প্রযোজ্য প্রতিটা আইনি পথে।
একটা বিশেষ লক্ষণীয় বিষয়: “Urban Wetlands” নামের প্রকল্প, সাভারে সক্রিয়, অথচ সেই প্রকল্পের কার্যক্রম-তালিকায় মধুমতির কোনো উল্লেখ নেই — যদিও একই সময়ে, ভিন্ন (Sida) প্রকল্পের অধীনে মধুমতির জন্য একটা contempt notice পাঠানো হয়েছিল। তারপর কী হলো — সেই notice আদালতে গড়াল কিনা, নাকি সেখানেই থেমে গেল — কোনো নথিতে নেই।
যা BELA নিজেই জানত, ব্যবহার করেনি বলে মনে হচ্ছে
BELA বাংলাদেশে পরিবেশ মামলার সবচেয়ে অভিজ্ঞ সংস্থা। শিপ ব্রেকিং, Roundup কীটনাশক, সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক মামলায় তারা ঠিক এই পদ্ধতিই ব্যবহার করেছে: আদালত অবমাননার হুমকি, নিয়মিত ফলো-আপ, জোট গঠন, মিডিয়া প্রচারণা। মধুমতিতে, রায়ের পর, একটা contempt notice ছাড়া এই টুলকিটের আর কোনো ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আর রিজওয়ানা হাসান নিজে, উপদেষ্টা থাকাকালীন, সিলেটের পাথর-লুট নিয়ে ফিল্ডে গেছেন, ক্যামেরার সামনে হতাশা দেখিয়েছেন, বিদ্যুৎ কেটেছেন। যে মামলা তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছিল, সেখানে তুলনীয় কোনো প্রকাশ্য উদ্যোগ দেখা যায়নি।
প্রশ্ন, এখনও খোলা
চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন, নাকি চেষ্টাই করেননি — এই ফারাকটা বিশাল, আর এটা রিজওয়ানা হাসান নিজেই স্পষ্ট করতে পারেন। কমিটি এত বছর একই থাকল কেন, এটা BELA নিজেই ব্যাখ্যা করতে পারে। দাতার টাকা কোথায় গেল, কী কাজে লাগল — সেটা দাতারা নিজেরাই নথি দিয়ে দেখাতে পারেন।
Bengal Gazette এই প্রশ্নগুলো BELA, রিজওয়ানা হাসান এবং ছয়টা দাতা সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠাচ্ছে। জবাব এলে, বা না এলে — দুটোই এই তদন্তের পরবর্তী পর্বে নথিভুক্ত হবে, যেখানে দাতার টাকার প্রকৃত ব্যয়, স্বচ্ছতা ও প্রমাণিত ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান থাকবে। সেখানে যদি অসংগতি পাওয়া যায়, তা এই প্রথম পর্বে ফিরে এসে ব্যাখ্যা করবে কেন এতজন এত বছর একই চেয়ারে থেকে গেলেন।
সম্পর্কিত অনুসন্ধান
এই প্রতিবেদন Bengal Gazette-এর মধুমতি মডেল টাউন তদন্তের একটা সমান্তরাল পর্ব। মূল প্রতিবেদন: “সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের ২৪ বছরের নীরবতা”
পদ্ধতি: এই প্রতিবেদনের প্রতিটি দাবি BELA-র নিজস্ব প্রকাশিত বার্ষিক রিপোর্ট, ওয়েবসাইট, ও সাংবাদিক-সাক্ষাৎকার থেকে সংগৃহীত প্রকাশ্য তথ্যের উপর দাঁড়ানো। যেখানে তথ্য এখনও অজানা, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। BELA, রিজওয়ানা হাসান, ও সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থাগুলোকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে — জবাব এলে তা যথাযথভাবে যুক্ত করা হবে।
সংশোধনী নীতি
এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত যেকোনো তথ্যগত ভুল বা অসম্পূর্ণতা প্রমাণসহ চিহ্নিত করা হলে বেঙ্গল গেজেট তা যাচাই করে যথাযথ সংশোধনী প্রকাশ করবে। যেকোনো উল্লেখিত পক্ষ বা ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য সম্পাদকীয় দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
Signal (গোপনীয় যোগাযোগ): abr.11 ·
editor@bengalgazette.asia
© ২০২৬ Bengal Gazette। কোম্পানি নং ১৭২৪৩৩৫৪ (ইংল্যান্ড ও ওয়েলস)। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।
পুনঃপ্রকাশ/লাইসেন্সিং: licensing@bengalgazette.asia
