রিজার্ভ চুরি মামলা: একদিনের ব্যবধানে সিআইডির দুই বিপরীত বক্তব্য, অনুত্তরিত থেকে গেল মৌলিক প্রশ্ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলার খসড়া চার্জশিট নিয়ে একই সিআইডি মুখপাত্র একদিনের ব্যবধানে দুই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। বেঙ্গল গেজেট শিগগিরই তথ্য অধিকার আইনে আবেদন ও সাংবাদিক অনুসন্ধানপত্র পাঠাচ্ছে।

প্রতিবেদন: Abeer Uz Zaman, Editor-in-Chief, Bengal Gazette

বেঙ্গল গেজেট আজ থেকে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের কাছে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন এবং সাংবাদিক অনুসন্ধানপত্র (প্রেস ইনকোয়ারি) পাঠাচ্ছে। প্রাপ্ত জবাবের ভিত্তিতে শিগগিরই এই বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।

একটি মামলা, এক দশক, ৯৬ বার বিলম্ব

২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে হ্যাকাররা প্রায় আট কোটি দশ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করে নেয়। ঘটনার পরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন উপপরিচালক মতিঝিল থানায় মামলা করেন। প্রায় এক দশক ধরে মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এই দীর্ঘ সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত তারিখ পিছিয়েছে ৯৬ বারের বেশি — সর্বশেষ শুনানিতে নতুন তারিখ ধার্য হয়েছে আগামী ৯ আগস্ট।

জুনে হঠাৎ অগ্রগতির খবর

দীর্ঘ স্থবিরতার পর গত ১৮ জুন একযোগে একাধিক গণমাধ্যমে খবর আসে, সিআইডি মামলার তদন্ত কার্যত শেষ করে একটি খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছে এবং তা আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, প্রায় দশ হাজার পৃষ্ঠার এই খসড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, চীন, ভারত, উত্তর কোরিয়া ও জাপানের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত।

একাধিক প্রতিবেদনে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীমউদ্দিন খানকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, খসড়া অভিযোগপত্রে বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, শ্রীলঙ্কা ও চীনের বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে আরও বলা হয়, তদন্তে সাবেক গভর্নরের গাফিলতি ও ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার তথ্য উঠে এসেছে, তবে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তাঁকে অভিযুক্তের তালিকায় না রাখতে চাপ ছিল বলেও দাবি করা হয়।

একদিন পর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান

কিন্তু এর ঠিক পরদিন, ১৯ জুন দুপুরে, সিআইডির একই মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, খসড়া চার্জশিট বা এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য সিআইডির কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে দেননি এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যকে সিআইডির আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে গণ্য না করার অনুরোধ জানান। সংস্থাটি সরকারিভাবে জানায়, মামলাটি এখনও তদন্তাধীন এবং তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

একই ব্যক্তির নামে প্রকাশিত দুটি বক্তব্যের মধ্যে এই সরাসরি অসামঞ্জস্য এখন পর্যন্ত কোনো গণমাধ্যম তুলনামূলকভাবে পর্যালোচনা করে দেখায়নি। ফলে স্পষ্ট নয় — ১৮ জুনের বিস্তারিত তথ্য কীভাবে গণমাধ্যমে পৌঁছাল, নাকি সেই তথ্য মুখপাত্রের বক্তব্য হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল।

প্রতিবেদনে প্রতিবেদনে গরমিল

বিষয়টি আরও জটিল হয় যখন দেখা যায়, ১৮ জুনের সংবাদগুলোর মধ্যেই দেশ-ভিত্তিক সংখ্যা ও নামের তালিকায় গরমিল রয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্তদের মধ্যে ফিলিপাইনের ৩৬, বাংলাদেশের ১০, উত্তর কোরিয়ার ২, চীনের ৩, শ্রীলঙ্কার ৮, ভারতের ৪ ও জাপানের ১ জন রয়েছেন। অন্য একটি প্রতিবেদনে ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন, ফিলরেম সার্ভিস কর্পোরেশন, সেঞ্চুরিটেক্স ট্রেডিং, আব্বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, বিকন কারেন্সি এক্সচেঞ্জ, মাইডাস ক্যাসিনো ও সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোর পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার সাত ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়। কোন সংখ্যা ও তালিকা সঠিক তা সিআইডির কোনো আনুষ্ঠানিক সূত্র নিশ্চিত করেনি।

মৌলিক প্রশ্নগুলো এখনও অনুত্তরিত

খসড়া চার্জশিট প্রস্তুতির খবরের মধ্যেও তদন্তের গোড়ার কিছু প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা গিয়েছিল কি না, ফুটেজ সংরক্ষিত হার্ডডিস্ক কেন নিখোঁজ হয়েছিল, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ কতটা নির্ভরযোগ্য এবং এত বড় আর্থিক সাইবার অপরাধে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতর থেকে কোনো সহযোগিতা ছিল কি না — এসব প্রশ্ন এক দশক ও কথিত দশ হাজার পৃষ্ঠার চার্জশিটের পরও প্রকাশ্য জবাবহীন রয়ে গেছে।

বেঙ্গল গেজেটের পরবর্তী পদক্ষেপ

এই অসংগতি ও অনুত্তরিত প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট জবাব পেতে বেঙ্গল গেজেট শিগগিরই অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী আবেদন পাঠাচ্ছে। একইসঙ্গে সিআইডির মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান এবং সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের কাছে তাঁদের বক্তব্য জানতে সাংবাদিক অনুসন্ধানপত্র (রাইট অব রিপ্লাই) পাঠানো হচ্ছে।

প্রাপ্ত জবাব ও নথির ভিত্তিতে বেঙ্গল গেজেট শিগগিরই এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।


সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা, ইত্তেফাক, বাংলা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, যুগান্তর, এনটিভি অনলাইন, জাগো নিউজ, বিডিনিউজ২৪, খবরসংযোগ, গ্রামেরকাগজ, আরথসূচক — জুন-জুলাই ২০২৬-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন।


পদ্ধতি: এই প্রতিবেদনের প্রতিটি দাবি আদালতের সার্টিফায়েড নথি, তথ্য অধিকার আইনে দাখিলকৃত আবেদন, অথবা রাইট টু রিপ্লাই-এর মাধ্যমে সংগৃহীত বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। যেখানে তথ্য এখনও যাচাইাধীন, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সংশোধনী নীতি: এই প্রতিবেদন ধারাবাহিকভাবে হালনাগাদ হবে। তথ্যগত ভুল থাকলে জানান — right to reply ট্র্যাকার বা সম্পাদকীয় ইমেইলে।

কপিরাইট নোটিশ:

© ২০২৬ Bengal Gazette | কোম্পানি নং ১৭২৪৩৩৫৪ (ইংল্যান্ড ও ওয়েলস) । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

এই প্রতিবেদনের কোনো অংশ — লেখা, তথ্য-উপস্থাপনা, বা গবেষণা — Bengal Gazette-এর লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো মাধ্যমে (প্রিন্ট, অনলাইন, সম্প্রচার, বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম) পুনঃপ্রকাশ, পুনঃবিতরণ, বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না। সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি সাংবাদিকতার স্বীকৃত রীতিতে (fair dealing), সরাসরি সূত্র উল্লেখ ও এই প্রতিবেদনের লিংকসহ অনুমোদিত।

পুনঃপ্রকাশ, সিন্ডিকেশন বা লাইসেন্সিং সংক্রান্ত অনুরোধের জন্য: licensing@bengalgazette.asia