শত ছাড়পত্রের ভিড়েও কেনো‘ডিগ্রেডেড’ ঢাকার এয়ারশেড ? হিসাব মেলাতে ফরেন্সিক লড়াই
ঢাকার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে জড়িয়ে আছে সাভার-ধামরাই-কালিয়াকৈরের ইটভাটার ধোঁয়া। দেড় বছরের অনুসন্ধান এবার নতুন ধাপে — ছাড়পত্রপ্রাপ্ত ভাটায় সরাসরি গিয়ে বায়ুমান মাপা, স্যাটেলাইট ও হিট ম্যাপ দিয়ে ক্রস-চেক, সরকারি নথির সাথে মিলিয়ে দেখা। লক্ষ্য একটাই — ছাড়পত্র বাস্তবে সত্যি, নাকি শুধু কাগজে।
প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন মানুষ এই দেশে বায়ুদূষণে মারা যান। সেই সংখ্যার একটা অংশের উৎস কি সাভার-ধামরাই-কালিয়াকৈরের ইটভাটা? ছাড়পত্র যদি জাল হয়, তাহলে এই মৃত্যু ঠেকানোর ব্যবস্থাটাই যে অকেজো — সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যন্ত্র, স্যাটেলাইট আর মাঠে নামছে বেঙ্গল গেজেট।
বেঙ্গল গেজেট বিশেষ অনুসন্ধানি প্রতিবেদন- পরিবেশ
একটা সংখ্যা দিয়ে শুরু করা যাক
প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের একটি গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান শহরে শুধু PM2.5 বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জন মানুষ অকালে মারা যান — গড়ে প্রতিদিন ২৪২ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঢাকায় — বছরে প্রায় ৬৮ হাজার ৭০৩ জন, যার মধ্যে গড়ে বছরে অতিরিক্ত ৩ হাজার ৪৮৪ জনের মৃত্যু সরাসরি PM2.5 দূষণের সাথে যুক্ত, আর এই সংখ্যা ২০১৩ থেকে ২০২১ পর্যন্ত প্রতি বছর বেড়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আরেকটি গবেষণা বলছে, পুরো দেশে বছরে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু হচ্ছে বায়ুদূষণে — যার মধ্যে ৫ হাজার ২৫৮ জন শিশু। শুধু পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হারে বায়ুদূষণজনিত ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স ২০২৪-এর হিসাবে, বায়ুদূষণের কারণে একজন গড় বাংলাদেশির আয়ু কমে যাচ্ছে ৪ দশমিক ৮ বছর — বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি।
আর ২০২৬ সালে একের পর এক মাসে — মার্চে, মে-তে দুইবার, এমনকি বর্ষার আগে জুনেও — সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের সূচকে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে বা প্রথম দশে উঠে এসেছে বারবার।
এই সংখ্যাগুলো পরিসংখ্যান না। প্রতিটা সংখ্যার পেছনে একটা পরিবার, একটা শিশুর ফুসফুস, একজন রিকশাচালকের কাশি, একজন মায়ের দুশ্চিন্তা।
সাভার-ধামরাই-কালিয়াকৈর কোথায় বসে এই ছবিতে
ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে আলোচনায় সাধারণত গাড়ি, নির্মাণকাজ আর কলকারখানার কথা আসে। কিন্তু বেঙ্গল গেজেটের আগের প্রতিবেদনগুলোতে (জুন ২০২৪-এ প্রথম প্রকাশিত “মেগাসিটির ইটের ভার” প্রতিবেদনে) দেখানো হয়েছিল — ঢাকার ঠিক পশ্চিম ও উত্তরে, সাভার, ধামরাই ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে শতাধিক ইটভাটা বছরের পর বছর ধরে রাজধানীর নির্মাণ খাতের চাহিদা মেটাচ্ছে, আর সেই সাথে বাতাসে ছড়াচ্ছে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা। পরিবেশবিদরা তখনই বলেছিলেন, শীতকালে ও শুষ্ক মৌসুমে এই ধোঁয়া বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে সরাসরি ঢাকার বাতাসে মিশে যায়।
ঠিক এই কারণেই ২০২৫ সালের আগস্টে পরিবেশ অধিদপ্তর সাভারকে “ডিগ্রেডেড এয়ারশেড” ঘোষণা করে বলেছিল — নির্দিষ্ট পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি (টানেল কিলন, হাইব্রিড হফম্যান কিলন) ছাড়া কোনো ভাটা চলতে পারবে না। এই ঘোষণাটা ছিল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি যে এই তিন উপজেলার ইটভাটাই ঢাকার বাতাসের একটা বড় অংশীদার।
কিন্তু ডিসেম্বর ২০২৫-এর প্রতিবেদনে (বেঙ্গল গেজেটের পূর্বসূরি অনুসন্ধানে) ভাটা মালিকরা নিজেরাই অভিযোগ করেছিলেন — অনেক ছাড়পত্র বাস্তব শর্ত পূরণ ছাড়াই, শুধু অর্থের বিনিময়ে ইস্যু হয়েছে। জুন ২০২৬-এর প্রতিবেদনে দেখানো হয় — নিষেধাজ্ঞার প্রায় এক বছর পরও মাঠপর্যায়ে অধিকাংশ ভাটা আগের মতোই চালু। আর জুলাই ২০২৬-এ আমরা জানিয়েছিলাম, এই প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তর খুঁজতে করা তথ্য অধিকার আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন।
যদি ছাড়পত্রই জাল হয়, তাহলে দূষণ ঠেকানো যাচ্ছে না কেন — একটা সহজ ব্যাখ্যা
এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে — সরকার তো আইন করেছে, ছাড়পত্র ব্যবস্থা তো আছে, তাহলে দূষণ কমছে না কেন?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে ছাড়পত্র ব্যবস্থার মূল যুক্তিতেই। ছাড়পত্র (ECC) আসলে একটা প্রতিশ্রুতির নথি — একটা ভাটা মালিক প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন, নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে চলবেন, নির্গমন সীমার মধ্যে থাকবেন। রাষ্ট্র সেই প্রতিশ্রুতি যাচাই করে ছাড়পত্র দেয়, আর তারপর নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পালিত হচ্ছে কিনা দেখে।
এই পুরো ব্যবস্থাটা তখনই কার্যকর, যখন যাচাই প্রক্রিয়াটা সত্যিকারের হয়। যদি ছাড়পত্র অর্থের বিনিময়ে, বাস্তব পরিদর্শন ছাড়াই ইস্যু হয়, তাহলে কাগজে “টানেল কিলন ব্যবহার করা হবে” লেখা থাকলেও বাস্তবে পুরনো, বেশি দূষণকারী প্রযুক্তিই চলতে থাকে — আর সরকারি হিসাবে সেই ভাটাটা “বৈধ, নিয়ম মানা” ভাটা হিসেবে গণ্য হয়। ফলাফল — রাষ্ট্রের খাতায় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা “কাজ করছে” দেখানো হয়, অথচ বাতাসে দূষণ কমে না এক বিন্দুও।
অর্থাৎ, ছাড়পত্র জালিয়াতি শুধু একটা প্রশাসনিক অনিয়ম না — এটা সরাসরি ২৪২ জনের প্রতিদিনের মৃত্যুর সাথে যুক্ত একটা প্রশ্ন। একটা জাল ছাড়পত্র মানে একটা ভাটা, যেটা “নিয়ন্ত্রিত” বলে তালিকাভুক্ত অথচ বাস্তবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিষ ছড়াচ্ছে।
আমরা কীভাবে এই জালিয়াতি প্রমাণ করব
এখানেই বেঙ্গল গেজেটের অনুসন্ধান একটা নতুন ধাপে প্রবেশ করছে — অভিযোগ শোনা থেকে সরাসরি যাচাইয়ে।
সরাসরি উপস্থিত থেকে বায়ুমান পরিমাপ। ছাড়পত্রপ্রাপ্ত ভাটাগুলোতে গিয়ে রিয়েল-টাইম বায়ুমান পরিমাপ করা হবে। ছাড়পত্রে যে প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা লেখা আছে, সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে নির্গমনের মাত্রা যা হওয়ার কথা, বাস্তব পরিমাপ তার সাথে মিলছে কিনা — এই তুলনাই প্রথম ধাপ।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ। Google Earth ও NASA-র উন্মুক্ত স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে প্রতিটা ভাটার প্রকৃত অবস্থান, আকার ও সময়ের সাথে সম্প্রসারণের ইতিহাস পর্যালোচনা করা হবে।
হিট ম্যাপ বিশ্লেষণ। তাপীয় (thermal) চিত্র দিয়ে প্রতিটা ভাটার সক্রিয়তা ও নির্গমনের তীব্রতার একটা স্বাধীন সূচক তৈরি করা হবে।
ড্রোন-ভিত্তিক ভেরিফিকেশন (প্রযোজ্য অনুমতি সাপেক্ষে)। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে, যেখানে সম্ভব, ড্রোন দিয়ে চিমনি-প্রযুক্তির ভিজ্যুয়াল প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে।
দূরত্ব ও শর্ত-সত্যতা যাচাই। ছাড়পত্রে উল্লিখিত প্রতিটা শর্ত — বসতি, বিদ্যালয়, কৃষিজমি, জলাশয় থেকে ন্যূনতম দূরত্ব — GPS পরিমাপের মাধ্যমে সরেজমিনে যাচাই করা হবে।
কেন তারা এটা এড়িয়ে যেতে পারবে না
সাধারণত এই ধরনের তদন্ত একটা নির্দিষ্ট সময়ের একটা “স্ন্যাপশট” মাত্র হয় — একদিন গিয়ে দেখা, তারপর চলে আসা। এমন তদন্ত সহজেই এড়ানো যায় — তদন্তকারী আসার খবর পেলে সাময়িকভাবে প্রযুক্তি বদলে ফেলা, বা সেদিনের মতো উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া সম্ভব।
আমাদের পদ্ধতি এই ফাঁকটা বন্ধ করে দেয়, কারণ এটা একটা মুহূর্তের ছবি না — এটা সময়ের সাথে চলা একটা ইতিহাস। স্যাটেলাইট চিত্র বছরের পর বছরের রেকর্ড রাখে — একটা ভাটা ২০২১ সালে কেমন ছিল, ২০২৩ সালে কতটা সম্প্রসারিত হয়েছে, ছাড়পত্র পাওয়ার ঠিক আগে-পরে তার আকার বা কাঠামোয় কোনো হঠাৎ পরিবর্তন এসেছিল কিনা — এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো ভাটা মালিক বা কর্মকর্তা মুছে ফেলতে পারবেন না, কারণ সেই তথ্য পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে ধারাবাহিকভাবে ধারণ করা হয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
একইভাবে, সরকারি নথি (কবে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, কবে পরিদর্শন হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে), মাঠের বাস্তব পরিমাপ, আর ভাটা মালিকদের নিজেদের আগের বক্তব্য (যা ইতিমধ্যে প্রকাশিত ও রেকর্ড হয়ে আছে) — এই তিনটা স্বাধীন উৎস একসাথে রাখলে কাউকে একটা নির্দিষ্ট দিনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে তদন্ত এড়ানোর সুযোগ থাকে না। কেউ যদি আজ প্রযুক্তি বদলে ফেলে, স্যাটেলাইট ইতিহাস তাও ধরে রাখবে যে গতকাল পর্যন্ত সেটা ছিল না।
এটাই এই অনুসন্ধানের মূল শক্তি — এককালীন পরিদর্শন না, বরং একটা অতীত পদচিহ্ন বিশ্লেষণ (footprint analysis), যেখানে বর্তমান অবস্থার পাশাপাশি অতীতের পুরো ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত যা হয়েছে
- জুন ২০২৪: সমস্যার সূচনা-প্রতিবেদন (Diner Suru)
- ডিসেম্বর ২০২৫: ভাটা মালিকদের ঘুষের অভিযোগ প্রকাশ (Diner Suru)
- জুন ২০২৬: তথ্য অধিকার আইনে আনুষ্ঠানিক আবেদন (The Daily Inqilab)
- জুলাই ২০২৬: আবেদনের অগ্রগতি — ফি পরিশোধ সম্পন্ন, তথ্য ডাকপথে অপেক্ষমাণ (Bengal Gazette)
- এখন: বৈজ্ঞানিক যাচাই পর্বের সূচনা
তথ্য অধিকার আইনে চাওয়া নথি হাতে আসা এবং মাঠ-যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পর, দুটোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। পরিবেশ আইন ও নীতি নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর সাথে এই অনুসন্ধানের ফলাফল ও পদ্ধতি ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
একটা শেষ কথা
এই অনুসন্ধান কোনো নির্দিষ্ট ভাটা মালিক বা কর্মকর্তাকে আগে থেকে দোষী ধরে নিয়ে শুরু হচ্ছে না। কিন্তু প্রতিদিন ২৪২ জন মানুষের মৃত্যুর পেছনে যদি কোনো অংশ এমন একটা ব্যবস্থার হয় যেটা কাগজে কাজ করছে অথচ বাস্তবে না — তাহলে সেই ব্যবধানটুকু খুঁজে বের করা নিছক সাংবাদিকতার অনুশীলন না, এটা একটা দায়িত্ব।
পদ্ধতি: এই প্রতিবেদনটি বেঙ্গল গেজেটের চলমান পরিবেশগত জবাবদিহিমূলক অনুসন্ধানের একটি পূর্বাভাস — অনুসন্ধানের পদ্ধতি ও পরিকল্পনা জনসমক্ষে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার জন্য প্রকাশিত। জাতীয় বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, স্বাস্থ্য প্রভাব ইনস্টিটিউট (HEI), এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স ও আইকিউএয়ার-এর প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধৃত। এতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই।
সংশোধনী নীতি: অনুসন্ধান এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এই সিরিজ হালনাগাদ হবে। তথ্যগত ভুল থাকলে জানান — right to reply ট্র্যাকার বা সম্পাদকীয় ইমেইলে।

