জুজুর দরজায় বেঙ্গল গেজেটঃRTI আইনে DGFI সহ ৯ সংস্থায় তথ্য চেয়ে আবেদন
বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থাকে তথ্য অধিকার আইনে প্রশ্ন করা একরকম ওপেন সিক্রেট ট্যাবু। বেঙ্গল গেজেট নয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে (যার মধ্যে NTMC ও DGFI-ও আছে) আনুষ্ঠানিক তথ্য আবেদন দাখিল করে সেই সীমারেখাটাই পরীক্ষা করছে — আইনের এমন একটা ধারা ব্যবহার করে, যা বাংলাদেশে সম্ভবত এর আগে কখনো এভাবে প্রয়োগ হয়নি।
মন্ত্রী, সচিব, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও প্রশ্ন করা যায় — কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার দরজায় প্রশ্ন তোলা বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় প্রায় একটা অলিখিত নিষিদ্ধ অঞ্চল। বেঙ্গল গেজেট এবার সেই সীমারেখাটাই আইনিভাবে পরীক্ষা করছে।
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার একটা অলিখিত সীমারেখা আছে — সবাই জানে, কেউ খুব একটা মুখে বলে না। মন্ত্রী, সচিব, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও প্রশ্ন করা যায়, তার সমালোচনা করা যায়, তার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চাওয়া যায়। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার দরজায় গিয়ে “আপনারা কী করছেন, কীভাবে করছেন” জিজ্ঞেস করা — এটা একটা ওপেন সিক্রেট নিষেধাজ্ঞা, লিখিত কোথাও নেই, কিন্তু প্রায় সবাই মেনে চলে।
আজ থেকে বেঙ্গল গেজেট সেই ধরে-নেওয়া সীমারেখাটাই পরীক্ষা করছে — ভয় দিয়ে না, আইন দিয়ে।
একটা আইনি পরীক্ষা যা আগে কখনো হয়নি
সর্বশেষ প্রকাশিত “যে কান রাষ্ট্রপ্রধানকেও ছাড় দেয়নি” প্রতিবেদনে আমরা দেখিয়েছিলাম, বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা নজরদারি যন্ত্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গোপন যোগাযোগ পর্যন্ত রেকর্ড করে ফেলেছিল। সেই প্রতিবেদনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় আমরা নয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক তথ্য আবেদন দাখিল করেছি — জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি — সরাসরি ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (NTMC), Directorate General of Forces Intelligence (DGFI), RAB ও বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরেও।
এখানেই আসল আইনি প্রশ্নটা দাঁড়ায়। তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৩২(১) অনুযায়ী, আইনের নিজস্ব তফসিলে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যে নিয়োজিত সংস্থার ক্ষেত্রে পুরো আইনই প্রযোজ্য না — অর্থাৎ এই সংস্থাগুলো সাধারণত তথ্য অধিকার আইনের বাইরে থাকার কথা। কিন্তু একই ধারার উপ-ধারা (২) স্পষ্ট ব্যতিক্রম রাখে: “উক্ত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কোন তথ্য দুর্নীতি বা মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার সহিত জড়িত থাকিলে এই ধারা প্রযোজ্য হইবে না।”
আইনি ব্যাখ্যা আরও নির্দিষ্ট করে — কোন ধারায়, কীভাবে
মূল ধারা: তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৩২
উপ-ধারা (১): “তফসিলে উল্লিখিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যে নিয়োজিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হইবে না।” — এটাই সাধারণ নিয়ম, যার কারণে NTMC, DGFI-র মতো সংস্থা সাধারণত RTI-এর বাইরে থাকে।
কিন্তু উপ-ধারা (২), যেটাই আমাদের আবেদনের ভিত্তি: “উপ-ধারা (১) এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, উক্ত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কোন তথ্য দুর্নীতি বা মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার সহিত জড়িত থাকিলে উক্ত ক্ষেত্রে এই ধারা প্রযোজ্য হইবে না।”
কেন আমাদের চাওয়া তথ্য এই ব্যতিক্রমের আওতায় পড়ে — নির্দিষ্ট করে:
- দুর্নীতির অংশ: আমরা আমদানি রেকর্ড, শুল্ক-শ্রেণিবিন্যাস, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, ক্রয়-অনুমোদন প্রক্রিয়া চেয়েছি — এগুলো সরাসরি সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রশ্ন। যদি এই ক্রয়ে ঘুষ, অতি-মূল্যায়ন, বা শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ থাকে (যা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয়েছে — মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে, উৎপত্তি দেশ গোপন রেখে চুক্তি), সেটা সরাসরি “দুর্নীতি”।
- মানবাধিকার লঙ্ঘনের অংশ: আমরা ব্যাপক, নির্বিচার নাগরিক নজরদারির সামষ্টিক পরিসংখ্যান চেয়েছি — এটা সরাসরি গোপনীয়তার অধিকার (সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৩) ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি (ICCPR অনুচ্ছেদ ১৭) লঙ্ঘনের প্রশ্ন।
উপ-ধারা (৩) অনুযায়ী প্রক্রিয়াটা কী: এই ব্যতিক্রম দাবি করা তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা তথ্য কমিশনের অনুমোদন নিয়ে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দিতে বাধ্য — অর্থাৎ সংস্থা নিজে থেকে “আমরা exempt” বলে এড়িয়ে যেতে পারে না; তাদেরও তথ্য কমিশনের কাছে গিয়ে অনুমতি নিতে হয়। এই প্রক্রিয়াটাই আমাদের আবেদনের সবচেয়ে বড় আইনি অস্ত্র — তারা চাইলেও একতরফাভাবে চুপ থাকতে পারে না, তাদেরও একটা প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিতে হবে, আর সেই পদক্ষেপটাও নিজেই একটা নথিভুক্ত ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।
আমাদের যাচাইয়ে আমরা বাংলাদেশে এই নির্দিষ্ট ধারাটা — গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভিত্তিতে ব্যতিক্রম দাবি করে RTI আবেদন — বাস্তবে কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়েছে এমন কোনো নথিভুক্ত নজির খুঁজে পাইনি। এই নয়টা আবেদন, বিশেষত NTMC ও DGFI-কে করা আবেদন দুটো, সম্ভবত বাংলাদেশে এই আইনি যুক্তির প্রথম বাস্তব প্রয়োগ।
ইতিহাস যা বলে — উত্তর সহজে আসে না
এই প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত রাখা দরকার। আমাদের নিজেদেরই আগের অভিজ্ঞতা (সাভারের ইটভাটা তদন্তে, একটা তুলনামূলক সহজ প্রশাসনিক প্রশ্নে) দেখিয়েছে — শুধু ফি-নির্ধারণের চিঠি হাতে পেতেই পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় লেগেছিল। নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংস্থার ক্ষেত্রে বিলম্ব, নীরবতা, বা সরাসরি প্রত্যাখ্যান — সবই বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা। কিন্তু আইনের ধারা ৯(৫) অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে জবাব না দেওয়াটাও নিজে একটা “প্রত্যাখ্যান” হিসেবে গণ্য হয় — অর্থাৎ নীরবতাও একটা আইনি ফলাফল, যা পরবর্তী ধাপে (আপিল, তথ্য কমিশনে অভিযোগ) ব্যবহারযোগ্য।
এটা কোনো বিচ্ছিন্ন লড়াই না — বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
নিরাপত্তা সংস্থার কাছে নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে তথ্য চাওয়া, আর প্রতিষ্ঠানের অস্বীকৃতির মুখোমুখি হওয়া — এটা বাংলাদেশের একার অভিজ্ঞতা না। যুক্তরাজ্যে Privacy International ২০১৬ সালে একাধিক পুলিশ বাহিনীর কাছে IMSI ক্যাচার (ঠিক আমাদের তদন্তের বিষয়বস্তুর মতোই প্রযুক্তি) নিয়ে তথ্য চেয়েছিল। পুলিশ “নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটাই করব না” কৌশলে সাড়া দেয়, মামলা ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত গড়ায়, আর ২০১৯ সালে ট্রাইব্যুনাল শেষ পর্যন্ত পুলিশের পক্ষেই রায় দেয়। একইভাবে ২০১৮ সালে Privacy International ও ACLU যৌথভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের FBI ও স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের বিরুদ্ধে সরকারি হ্যাকিং কৌশল নিয়ে তথ্য মামলা করেছিল।
এই নজিরগুলো একটা কথাই বলে — উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও নিরাপত্তা সংস্থার কাছ থেকে নজরদারি প্রযুক্তির তথ্য বের করা অত্যন্ত কঠিন, প্রায়ই ব্যর্থ হয়। তাই আমরা এই লড়াইয়ে দ্রুত বা সহজ ফলাফলের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। কিন্তু প্রতিটা প্রত্যাখ্যান, প্রতিটা নীরবতা নিজেই একটা তথ্য — আর সেই তথ্যও প্রকাশযোগ্য।
কারা এই প্রতিবেদন করছে
এই ধরনের সংবেদনশীল অনুসন্ধানে প্রতিবেদকের পেশাগত প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা-সচেতনতা পাঠকের জানার অধিকার আছে বলে আমরা মনে করি।
এই অনুসন্ধানের নেতৃত্বে থাকা প্রতিবেদক পূর্বে Reuters-এর সাথে Local Producer (TV) হিসেবে কাজ করেছেন বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কভারেজে, এবং বর্তমানে Earth Journalism Network (EJN)-এর একটি ফেলোশিপ প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত। তিনি USAID/MRDI/Internews থেকে Ethical Journalism ও Fact-Checking এবং Data Journalism-এ, FOJO Media Institute (Linnaeus University, সুইডেন) থেকে ডেটা সাংবাদিকতায়, এবং জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-র অধীনে অভিবাসী ও শরণার্থী সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও সনদ অর্জন করেছেন।
সুরক্ষার ব্যবস্থা — এবং এটা প্রকৃতপক্ষে কীভাবে কাজ করে
এই প্রতিবেদক Forbidden Stories পরিচালিত আন্তর্জাতিক #SafeBoxNetwork-এর সদস্য। এই নেটওয়ার্কের মূলনীতি — “কিলিং দ্য মেসেঞ্জার উইল নট কিল দ্য মেসেজ” (বার্তাবাহককে থামালেও বার্তা থামে না)। ব্যবহারিক অর্থে এর মানে — এই অনুসন্ধানের একটা নিরাপদ কপি ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক এই নেটওয়ার্কে সংরক্ষিত আছে। কোনো কারণে এই প্রতিবেদক কাজ চালিয়ে যেতে অক্ষম হয়ে পড়লে, অনুসন্ধানটা সেখানেই থেমে যাবে না — বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের একটা নেটওয়ার্ক সেটা সম্পূর্ণ করে প্রকাশ করার ব্যবস্থা এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। এটাই এই ধরনের প্রতিবেদনের প্রকৃত সুরক্ষা কাঠামো — কাউকে চুপ করিয়ে দিয়ে পুরো অনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়া কার্যত অসম্ভব করে তোলা।
এছাড়া, এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগে Committee to Protect Journalists (CPJ), Reporters Without Borders (RSF) এবং Article 19-কে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংবেদনশীল অনুসন্ধান সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা দ্রুত সমন্বয় করা যায়।
সামনে কী
প্রতিটা দপ্তরের জবাব, প্রত্যাখ্যান বা নীরবতা — সবকিছু নথিভুক্ত করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হলে বা সব উত্তর হাতে এলে, একটা পূর্ণাঙ্গ তুলনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে — কোন দপ্তর জবাব দিলো, কোনটা দিলো না, আর ধারা ৩২(২)-এর এই আইনি পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো।
এই অনুসন্ধান কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগে থেকে দোষী ধরে নিয়ে শুরু হয়নি। লক্ষ্য একটাই — একটা রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানোর ক্ষমতা রাখে, সেই ক্ষমতার ওপর আইনের নিজস্ব জবাবদিহিতা-ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করে দেখা।
পদ্ধতি: এই প্রতিবেদনটি বেঙ্গল গেজেটের চলমান নজরদারি-জবাবদিহিতা অনুসন্ধানের একটি পদ্ধতিগত হালনাগাদ, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর মূল টেক্সট এবং Privacy International, ACLU-র প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মামলার তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। এতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই।
সংশোধনী নীতি: দপ্তরগুলোর জবাব পাওয়ার সাথে সাথে এই সিরিজ হালনাগাদ হবে। তথ্যগত ভুল থাকলে জানান — right to reply ট্র্যাকার বা সম্পাদকীয় ইমেইলে।

