যে কান প্রধানমন্ত্রীকেও ছাড় দেয়নি; বিদেশী আড়িপাতার যন্ত্রে রাষ্ট্র ও ব্যক্তি কতটুকু নিরাপদ?
বিদেশি যন্ত্রে তৈরি রাষ্ট্রীয় গোপন রেকর্ড কীভাবে বিদেশি গণমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছে গেল, আর এই একই ব্যবস্থা কি আপনার ফোনকেও নিরাপদ রাখতে পারবে — সাবমেরিন ক্যাবল থেকে Pegasus পর্যন্ত, একটা পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান।
বেঙ্গল গেজেটের বিশেষ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ
একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক।
আপনি যখন ফোনে কথা বলেন — পরিবারের সাথে, বন্ধুর সাথে, অফিসের সহকর্মীর সাথে — আপনি কি কখনো ভাবেন, এই কথাগুলো আর কেউ শুনছে কিনা?
বেশিরভাগ মানুষ ভাবেন না। যুক্তিটা সহজ — “আমি তো কিছু লুকাচ্ছি না, ভয় কীসের।” এই প্রতিবেদন শেষ করার পর এই যুক্তিটা আর ততটা নিরাপদ শোনাবে না। কারণ যে ব্যক্তি নিজেই একদিন এই দেশের নজরদারি ব্যবস্থার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক ছিলেন, তার নিজের ফোনও শেষ পর্যন্ত রেহাই পায়নি।
একটা ফোনকল যেভাবে পৃথিবী পাড়ি দেয়
আপনি যখন ফোনে কথা বলেন বা মেসেজ পাঠান, সেই সিগন্যাল প্রথমে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে নিকটতম মোবাইল টাওয়ারে পৌঁছায়। ওয়াইফাই ব্যবহার করলে সেটা যায় আপনার রাউটারে, তারপর ইন্টারনেট সেবাদাতার লাইনে। সেখান থেকে সিগন্যাল যায় আপনার মোবাইল অপারেটরের (গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক) কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কে।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এরপর সেটা যেতে হয় সরকার-অনুমোদিত International Internet Gateway (IIG) দিয়ে — একটা নিয়ন্ত্রক চেকপয়েন্ট, যার মধ্য দিয়ে সব আন্তর্জাতিক ডেটা প্রবাহিত হয়। এরপর গন্তব্য কক্সবাজারের BSCCL (Bangladesh Submarine Cable Company Ltd) ল্যান্ডিং স্টেশন, যেখান থেকে ডেটা প্রবেশ করে সমুদ্রের নিচের ফাইবার-অপটিক ক্যাবলে — SEA-ME-WE 4 ও SEA-ME-WE 5 কনসোর্টিয়ামের ক্যাবল, যা বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যের সাথে যুক্ত করে। বিশ্বের প্রায় ৯৫-৯৯% আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক এই সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমেই চলাচল করে — স্যাটেলাইট (Starlink সহ) দিয়ে যায় সামান্য অংশই।
একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা — ভিপিএন আপনার ডেটার বিষয়বস্তু এনক্রিপ্ট করে ও গন্তব্য আড়াল করে, কিন্তু এটা শারীরিক পথ বদলায় না। আপনার এনক্রিপ্টেড ডেটাও একই টাওয়ার, একই গেটওয়ে, একই সাবমেরিন ক্যাবল দিয়েই যায়।
সমুদ্রের তলদেশেও কান পাতা হয় — এটা নতুন কিছু না
২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথিতে প্রকাশ পায়, যুক্তরাষ্ট্রের NSA ও যুক্তরাজ্যের GCHQ পরিচালিত “TEMPORA” নামের একটা প্রোগ্রামের কথা — যেখানে সরাসরি সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনে প্রবেশাধিকার নিয়ে ডেটার কপি সংরক্ষণ করা হতো। এমনকি স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও, “Operation Ivy Bells” নামের একটা মার্কিন অভিযানে সরাসরি সাবমেরিন দিয়ে সোভিয়েত আন্ডারওয়াটার কেবলে ট্যাপ বসানো হয়েছিল বলে প্রকাশ্যে জানা যায়। এই ধরনের অভিযানের জন্য প্রয়োজন হয় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রবেশাধিকার — এটা কোনো ব্যক্তি বা ছোট গোষ্ঠীর কাজ না।
বাংলাদেশে যা কেনা হয়েছে — নথিভুক্ত ইতিহাস
আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের নজরদারি যন্ত্র ক্রয়ের একটা দীর্ঘ, ভালোভাবে-নথিভুক্ত ইতিহাস প্রকাশ করেছে।
আল জাজিরার ২০২১ সালের অনুসন্ধান অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইসরায়েলি প্রযুক্তি “P6 Intercept” কিনেছিল, ব্যাংকক-ভিত্তিক এক আইরিশ মধ্যস্থতাকারী জেমস মোলোনির মাধ্যমে। DGFI-এর কর্মকর্তাদের হাঙ্গেরিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, চুক্তিতে উৎপত্তি দেশ “হাঙ্গেরি” লেখা থাকলেও গোপন রেকর্ডিংয়ে মধ্যস্থতাকারী নিজেই স্বীকার করেন এটা প্রকৃতপক্ষে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান PicSix-এর তৈরি। Privacy International-এর বিশ্লেষক এলিয়ট বেন্ডিনেলি আল জাজিরাকে বলেছেন, এই যন্ত্র একসাথে ২০০-৩০০টা মোবাইল ফোন ট্র্যাক করতে সক্ষম — এটা সেল টাওয়ারের ভান করে আশপাশের সব ফোনকে নিজের সাথে সংযুক্ত করে ফেলে, তারপর টেক্সট, কল, ইন্টারনেট ব্যবহার — সবকিছু ইন্টারসেপ্ট করে।
২০২৩ সালে ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ (পরবর্তীতে দ্য ডেইলি স্টারে পুনঃপ্রতিবেদিত) জানায়, ২০২১ সালে বাংলাদেশ সরকার ৬৫.৫৬ কোটি টাকায় “SpearHead” নামের একটা গাড়ি-মাউন্টেড নজরদারি ব্যবস্থা কিনেছে — যেটা তৈরি করেছে সাইপ্রাস-নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান Passitora (আগে পরিচিত ছিল ইসরায়েলি স্টার্টআপ WiSpear নামে), মালিক তাল দিলিয়ান, প্রাক্তন ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। মধ্যস্থতা করে সুইস-নিবন্ধিত Toru Group, যার সিইও ইসরায়েলি নাগরিক আসাফ ইলিয়াস। একই প্রতিবেদনে জানা যায়, আরেকটা ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান Prelysis ২০১৯ সালে প্রায় ৩০ লাখ ডলারে “Wagtail Wifi Interception System” বিক্রি করেছে বাংলাদেশের একটা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে।
আর দ্য ডেইলি স্টারের নিজস্ব অনুসন্ধান (সাংবাদিক জাইমা ইসলাম, মোহাম্মদ সুমন, মাহমুদুল হাসান — যা গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের ২০২৫ সালের সেরা তালিকায় স্থান পেয়েছে) প্রকাশ করে, পুলিশ, RAB ও NTMC যৌথভাবে ১,৩৮২ কোটি টাকার নজরদারি যন্ত্রপাতি কিনে একটা জাতীয় ইন্টারসেপশন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছিল।
এসব যন্ত্র আসলে কী করতে পারে
এই যন্ত্রগুলোর ভয়াবহতা তাদের স্কেলে — এগুলো একজন-দুজনকে নির্দিষ্টভাবে টার্গেট করার যন্ত্র না, এগুলো একসাথে শত শত মানুষকে, কোনো নির্দিষ্ট সন্দেহ ছাড়াই, নজরদারির আওতায় আনতে সক্ষম।
Pegasus-এর মতো আধুনিক স্পাইওয়্যারের কার্যপ্রণালী ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধানে বর্ণিত — একটা তিন-ধাপের প্রক্রিয়া: Target (একটা লিংক পাঠানো হয়, অথবা কোনো ক্লিক ছাড়াই সংক্রমণ ঘটে — “zero-click” পদ্ধতি), Infect (ফোনের ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, অবস্থান তথ্য, কল লগ, কন্ট্যাক্ট — সবকিছু কপি করে নেয়), আর Track (এই তথ্য দূরবর্তী একজন অপারেটরের কাছে পাঠাতে থাকে, যিনি ভুক্তভোগীর জীবনের খুঁটিনাটি মানচিত্র তৈরি করতে পারেন)।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বোঝা দরকার — এই ধরনের স্পাইওয়্যার একবার একটা ফোনে বসে গেলে, এটা ফোনের অপারেটিং সিস্টেম স্তরেই কাজ করে, প্রায় ফোনের নিজস্ব ক্ষমতার সমান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। আপনি যখন কিবোর্ডে পাসওয়ার্ড টাইপ করেন, প্রতিটা স্পর্শ একটা সিস্টেম-স্তরের ইভেন্ট — আর malware এই ইভেন্ট সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারে, আপনার অ্যাপ সেই তথ্য এনক্রিপ্ট করার সুযোগ পাওয়ার আগেই। এটাই কারণ কেন WhatsApp বা Signal-এর মতো “এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড” অ্যাপও এই আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয় না — এনক্রিপশন সুরক্ষা দেয় বার্তা পাঠানোর সময়টুকু, কিন্তু আপনি নিজে টাইপ করা বা পড়ার মুহূর্তে ডিভাইসেই তথ্য “খোলা” অবস্থায় থাকে, ঠিক তখনই এটা সংগ্রহ হয়ে যায়। এনক্রিপশন ভাঙা হয় না — এটা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। তালা যত শক্তই হোক, দরজার ওপাশে যদি কেউ আগে থেকেই বসে থাকে, তালার মূল্য থাকে না।
এটা প্রতিরোধ করা অত্যন্ত কঠিন, প্রায় অসম্ভবই বলা চলে সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য — যদিও সম্পূর্ণ অসম্ভব না। নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীদের জন্য Apple-এর “Lockdown Mode”, আর Amnesty International-এর তৈরি Mobile Verification Toolkit দিয়ে সংক্রমণ পরবর্তীতে শনাক্ত করা সম্ভব — প্রতিরোধ না, কিন্তু প্রমাণ পাওয়া।
এই প্রযুক্তির বাস্তব, ভয়াবহ প্রভাব — বৈশ্বিক নজির
জামাল খাশোগি হত্যা (২০১৮): সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে খুন হন। ওয়াশিংটন পোস্ট ও Citizen Lab-এর ফরেনসিক তদন্তে প্রমাণিত হয়, তার স্ত্রী হানান এলাত্রের ফোনে Pegasus বসানো হয়েছিল হত্যার কয়েক মাস আগে, আর তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ফোনও একই স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে নজরদারির আওতায় ছিল। NSO Group (Pegasus-এর নির্মাতা) বারবার সরাসরি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন এই সংযোগ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে।
মোহসেন ফাখরিজাদেহ হত্যা (২০২০): ইরানের প্রধান পরমাণু বিজ্ঞানী তেহরানের কাছে নিহত হন একটা রিমোট-নিয়ন্ত্রিত মেশিনগানের মাধ্যমে, যেটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মুখ-শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে চিহ্নিত করে গুলি চালায় বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অস্ত্র (একটা মার্কিন-নির্মিত M240C মেশিনগান) খুচরা যন্ত্রাংশ আকারে ইরানে পাচার করে প্রায় ২০ জনের একটা মোসাদ দল আট মাস ধরে সংযোজন করেছিল। ইরান এই হত্যার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।
হিজবুল্লাহর পেজার বিস্ফোরণ (সেপ্টেম্বর ২০২৪): নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল তাইওয়ানের Gold Apollo থেকে হিজবুল্লাহর জন্য অর্ডার করা পেজারের একটা চালানে বিস্ফোরক লুকিয়ে রাখে, সরবরাহ-শৃঙ্খলে অনুপ্রবেশ করে। ১৭ সেপ্টেম্বর একযোগে হাজার হাজার পেজার বিস্ফোরিত হয় (অন্তত ১২ জন নিহত, প্রায় ২,৮০০ জন আহত), পরদিন ওয়াকিটকিতেও একই ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। CBS News-এর প্রতিবেদনে সাবেক মোসাদ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এটা একটা বহু-মাস ব্যাপী পরিকল্পিত প্রতারণামূলক অভিযান ছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মৃত্যু (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬): যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে তেহরানের অতি-সুরক্ষিত পাস্তুর জেলায় (যেখানে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও সর্বোচ্চ নেতার বাসভবন) হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, একই সাথে ইরানের কয়েক ডজন শীর্ষ নেতা ও সামরিক কর্মকর্তা। (এই হামলায় সুনির্দিষ্ট অবস্থান-নির্ধারণে ঠিক কোন পদ্ধতি ব্যবহার হয়েছিল, তার বিস্তারিত এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি — এটা নির্ভুল সামরিক টার্গেটিং সক্ষমতার একটা সাম্প্রতিক নজির হিসেবেই এখানে উল্লেখ করা হলো, নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুমান না করে।)
এই ঘটনাগুলো একসাথে দেখায় — আধুনিক নজরদারি ও টার্গেটিং প্রযুক্তি নিছক তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় না, এটার বাস্তব, প্রাণঘাতী পরিণতি আছে।
বাংলাদেশে ফাঁস হওয়া কথোপকথনের প্যাটার্ন
বাংলাদেশে ফোনালাপ ফাঁসের ইতিহাস নতুন কিছু না। প্রথম আলোর ২০২১ সালের একটা বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে LEARN Asia-র সিনিয়র পলিসি ফেলো আবু সাঈদ খান ব্যাখ্যা করেন, কথোপকথন ফাঁসের ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন দুই পক্ষ থাকে — ফোনের দুই প্রান্তে থাকা ব্যক্তিরা নিজেরাই, অথবা যাদের আইনি আড়িপাতার ক্ষমতা আছে (রাষ্ট্রীয় সংস্থা)। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ফোন ঐতিহাসিকভাবে এই তালিকায় বেশি এসেছে, আর আদালতের রায়ের পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর থেকে শেখ হাসিনার একাধিক ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে — কোনোটা প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে, কোনোটা সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটা রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপকভাবে অনেকে সেটাকে “ভুয়া” বলে দাবি করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (CID) সরকারিভাবে নির্দেশ দিতে হয় এসব ভয়েস রেকর্ডিংয়ের সত্যতা যাচাই করার জন্য — যা নিজেই প্রমাণ করে, এই রেকর্ডিংগুলোর সত্যতা একটা বাস্তব, অমীমাংসিত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
হ্যাকিং নয়, ফরেনসিক পুনরুদ্ধার — একটা পরিভাষাগত সংশোধন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেছেন, প্রসিকিউশন টিমের জন্য একজন ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যিনি জুলাই আন্দোলনের সময়কার শেখ হাসিনার মুছে ফেলা কল রেকর্ড উদ্ধার করেন — তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর জোহার তথ্য অনুযায়ী, চারটি ফোন নম্বরের প্রায় এক হাজার কল রেকর্ড একাধিকবার মুছে ফেলার চেষ্টার পরও।
এই বিবরণ সামাজিক মাধ্যমে সরলীকৃত হয়ে “হ্যাকিং” নামে ছড়িয়েছে। কিন্তু এটা প্রযুক্তিগতভাবে ভুল পরিভাষা। হ্যাকিং মানে অননুমোদিতভাবে কোনো সিস্টেমে প্রবেশ করা, যার নিয়ন্ত্রণ প্রবেশকারীর হাতে নেই। এখানে যা ঘটেছে তা হলো — এনটিএমসি নিজেই একটা রাষ্ট্রীয় সংস্থা, আর তথ্য উদ্ধার হয়েছে তারই সার্ভার থেকে, রাষ্ট্রের নিজস্ব তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে। এটা ডিজিটাল ফরেনসিক পুনরুদ্ধার — সম্পূর্ণ ভিন্ন, স্বীকৃত একটা পেশাগত ক্ষেত্র। মুছে ফেলা তথ্য উদ্ধারের পেছনের নীতিও সহজ ও সুপরিচিত — কোনো ফাইল “ডিলিট” করা মানে তা সাথে সাথে অস্তিত্বহীন হওয়া না, নতুন তথ্য দিয়ে ওভাররাইট না হওয়া পর্যন্ত পুরনো তথ্য কার্যত থেকেই যায়।
“এথিক্যাল হ্যাকিং” নামকরণও এখানে যথাযথ না — এই পরিভাষার প্রতিষ্ঠিত সংজ্ঞা হলো, প্রতিষ্ঠান নিজের সম্মতিতে একজন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে নিজের সিস্টেমের নিরাপত্তা-দুর্বলতা পরীক্ষা করানো। এখানে যা ঘটেছে তা নিরাপত্তা-দুর্বলতা পরীক্ষা না, তদন্তের জন্য প্রমাণ সংগ্রহ — সঠিক পরিভাষা হওয়া উচিত ছিল “ফরেনসিক তদন্তকারী”, “হ্যাকার” না।
BBC-র উৎস, আর কেন এটা আইনসম্মত সাংবাদিকতা
জুলাই ২০২৫-এ BBC Eye ও BBC বাংলা যৌথভাবে একটা ১৮ জুলাইয়ের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে জানায়, শেখ হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে। একাধিক আন্তর্জাতিক সূত্র (দ্য ডেইলি স্টার, Asia News Network, BSS) স্পষ্টভাবে লিখেছে — “The source of the leak remains unknown” — এই রেকর্ডিং মার্চ ২০২৫-এ অনলাইনে বেনামে ফাঁস হয়েছিল, BBC নিজে এনটিএমসি থেকে কিছু সংগ্রহ করেনি। BBC এই ইতিমধ্যে-প্রকাশ্য রেকর্ডিং যুক্তরাজ্যের Earshot নামের একটা অডিও ফরেনসিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করে (Electric Network Frequency বিশ্লেষণ, কণ্ঠস্বরের প্যাটার্ন পরীক্ষা করে টেম্পারিং বা AI-জেনারেটেড কিনা নিশ্চিত করে), আর বাংলাদেশ পুলিশের CID-র ভয়েস-ম্যাচের সাথে ক্রস-চেক করে।
এটা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার একটা প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত মডেল — ইতিমধ্যে ফাঁস হওয়া তথ্য নিজে অবৈধভাবে সংগ্রহ না করে, স্বাধীনভাবে যাচাই করে, স্পষ্ট জনস্বার্থে (প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হওয়া সহিংসতার প্রমাণ) প্রকাশ করা। মূল অবৈধতার দায় থাকে ফাঁসকারীর, প্রতিবেদনকারীর না।
কিন্তু আইনি বৈধতা আর নিরাপত্তাগত ঝুঁকি — এই দুটো ভিন্ন প্রশ্ন। একটা রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল নজরদারি অবকাঠামোর অভ্যন্তরীণ রেকর্ড একবার ফাঁস হয়ে গেলে, তারপর একটা বিদেশি সম্প্রচার সংস্থার ল্যাবে বিশ্লেষিত হলে — এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। BBC-র কাজ আইনসম্মত হলেও, এই ঘটনাটাই প্রমাণ করে — একবার এই ধরনের গোপন রেকর্ড ব্যবস্থার বাইরে বেরিয়ে গেলে, সেটা কার হাতে যাবে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে, তার ওপর রাষ্ট্রের কোনো এখতিয়ার থাকে না।
আর এখানেই একটা যৌক্তিক প্রশ্ন এড়ানো যায় না — যদি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির ফোনালাপই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিদেশি সম্প্রচার সংস্থার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তাহলে বর্তমান প্রশাসন বা সরকারের কোনো ব্যক্তির তথ্যও কি একই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়ে একইভাবে অরক্ষিত থাকতে পারে না? ভবিষ্যতে অনুরূপ কোনো তথ্য কোনো বিদেশি পক্ষের হাতে যাচ্ছে না, এমন নিশ্চয়তা রাষ্ট্র নিজেও দিতে পারে না — কারণ প্রথম ফাঁসের উৎসই আজও অজানা।
একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ফোনালাপ যদি সাধারণ ইন্টারনেট সার্চেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়, কোনো বিশেষ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ছাড়াই — তাহলে রাষ্ট্রের সবচেয়ে উঁচু পদের মানুষের গোপনীয়তাই যেখানে এতটা ভঙ্গুর, সাধারণ নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার কাঠামো বাস্তবে কতটা মজবুত, সেই প্রশ্নটা নিজেই একটা উত্তর বহন করে।
দেশীয় মিডিয়ার প্যাটার্ন — আগেও ফাঁস হয়েছে
BBC-র ক্ষেত্রে যা আইনসম্মত সাংবাদিকতা, দেশীয় প্রেক্ষাপটে সব ঘটনা একই মানদণ্ডে পড়ে না। ২০২১ সালে সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের দুইজন অভিনয়শিল্পীর সাথে ফোনালাপ ফাঁস হয়, যার জেরে তিনি মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বাধ্য হন। এই ঘটনা BBC-র case-এর চেয়ে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে দাঁড়ায় — এটা কোনো আদালতি প্রক্রিয়ার অংশ ছিল না, সরাসরি সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালে ছড়িয়েছিল।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ধারা ৮৩ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত বার্তার অবৈধ প্রকাশের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির দেওয়ানী প্রতিকারের অধিকার আছে — এই ধরনের ঘটনায় এই ধারা প্রাসঙ্গিক হতে পারত। তবে সাংবাদিকতার একটা প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নীতিও এখানে প্রযোজ্য — একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি ব্যক্তির আচরণ কতটা “সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত” থাকে, নাকি জনস্বার্থের আওতায় পড়ে, এটা একটা দীর্ঘদিনের বিতর্ক। সততার সাথে বলা দরকার — এই নির্দিষ্ট ফাঁসের জন্য ধারা ৮৩-এর অধীনে কাউকে দায়ী করে কোনো মামলা বা রায়ের প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, আইনি ঝুঁকি তাত্ত্বিকভাবে ছিল, বাস্তবে প্রয়োগ হয়নি।
এটাই বাংলাদেশে একটা বড় প্যাটার্নের অংশ — ব্যক্তিগত ফোনালাপ ফাঁস হওয়া এতটাই নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে যে, আইন কাগজে থাকলেও তার প্রয়োগ প্রায় অনুপস্থিত। আইন আছে, প্রয়োগ নেই।
আইনি কাঠামো — কী বলে বাংলাদেশের আইন
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ (সংশোধিত):
- ধারা ৭১: টেলিফোনে আড়িপাতার দণ্ড — মূলত ৬ মাস কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ছিল, ২০১০ সালের সংশোধনীতে বাড়িয়ে করা হয় ২ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা জরিমানা। তবে এই ধারায় স্পষ্ট ব্যতিক্রম আছে — সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত গোয়েন্দা/জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই দণ্ড প্রযোজ্য না।
- ধারা ৮৩: বার্তার অবৈধ প্রকাশের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির দেওয়ানী মামলার অধিকার।
সাইবার আইনের পরিবর্তনশীল ইতিহাস: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর বিতর্কিত ৫৭ ধারা পরবর্তীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, যা পরে বাতিল হয়ে আসে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩। এই আইনও পরবর্তীতে রহিত হয়ে যায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর মাধ্যমে, আর বর্তমানে বলবৎ আছে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬। Transparency International Bangladesh ২০২৩ সালের খসড়ার সমালোচনা করে বলেছিল, এতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নিবর্তনমূলক উপাদান হুবহু প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা: বাংলাদেশে বর্তমানে বলবৎ আছে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ (আগে ২০২২-২৩ সালে এটা খসড়া পর্যায়ে ছিল)। এই আইনে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত উপাত্তের সংজ্ঞায় বায়োমেট্রিক্স, ধর্ম, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, স্বাস্থ্য, ভূ-অবস্থান অন্তর্ভুক্ত, আর ডেটা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে জানানো বাধ্যতামূলক — এটা কাঠামোগতভাবে যুক্তরাজ্যের GDPR-এর সাথে কিছুটা তুলনীয়। তবে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা/নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এই আইনের আওতায় ঠিক কতটা পড়ে, বা কী ছাড় পায়, তা একটা গুরুত্বপূর্ণ, বিস্তারিত পর্যালোচনার দাবি রাখে।
আদালতের নীরবতা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাধিক কল রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছে, কিন্তু এই রেকর্ড কীভাবে ফাঁস হলো তার তদন্তের নির্দেশ, বা ভবিষ্যতে নজরদারি নিয়ন্ত্রণের কোনো সংস্কারমূলক আদেশ এই ট্রাইব্যুনাল থেকে আসেনি। এর একটা কাঠামোগত ব্যাখ্যা আছে — এই ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার সুনির্দিষ্ট, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুতর অপরাধের বিচার করা, নীতিনির্ধারণ এর কাজ না। কিন্তু এই ব্যাখ্যার পরও প্রশ্ন থেকে যায় — একটা রাষ্ট্র যখন প্রমাণ করে ফেলে তার সবচেয়ে সুরক্ষিত নজরদারি অবকাঠামোই ফাঁসের ঝুঁকিতে ছিল, তখন কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত একটা পৃথক তদন্ত বা নীতিগত পর্যালোচনার উদ্যোগ প্রত্যাশিত ছিল। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এমন কোনো উদ্যোগের প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
উৎস অজানা — প্রশ্নটা আপনাদের জন্য রেখে গেলাম
BBC নিজেই স্বীকার করেছে, হাসিনার কল রেকর্ড ঠিক কার মাধ্যমে ফাঁস হয়েছে তা অজানা। সম্ভাব্য ব্যাখ্যা একাধিক, প্রতিটাই সমান অপ্রমাণিত — রাষ্ট্রের ভেতরে কেউ ইচ্ছাকৃত বা অসাবধানতাবশত, ৫ আগস্টের বিশৃঙ্খল সময়ে সার্ভার নিয়ন্ত্রণ হাতবদলের ফাঁকে, যে বিদেশি কোম্পানি এই যন্ত্র সরবরাহ করেছিল তাদের নিজস্ব সিস্টেমের কোনো দুর্বলতা, অথবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কোনো অংশ। আমরা জানি না।
আর এখানেই আসল প্রশ্ন — একটা রাষ্ট্র, যে নিজের নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালাতে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে যন্ত্র কিনে, সেই রাষ্ট্র কি জানে তাদের নিজেদের সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্য শেষ পর্যন্ত কার হাতে, কীভাবে যায়? যদি না জানে — যে কোম্পানি এই যন্ত্র বানিয়েছে, যে দেশে তাদের মালিকানা, যে দেশের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কই নেই — তাদের হাতে একবার তথ্য প্রবেশ করলে সেটা সত্যিই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে, নাকি নিয়ন্ত্রণটা কখনোই সত্যিকার অর্থে ছিলই না, প্রথম চুক্তিতে সই হওয়ার দিন থেকেই? উত্তর আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম।
তাহলে আপনার জন্য এর মানে কী
প্রধানমন্ত্রীর ফোনই যদি এই ব্যবস্থার হাত থেকে বাঁচতে না পারে, একজন সাধারণ নাগরিকের ফোন বাঁচবে — এই ভরসা করার কোনো যৌক্তিক কারণ অবশিষ্ট থাকে না।
যে ব্যক্তি নিজেই এই নজরদারি ব্যবস্থার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক ছিলেন, যার সরকারের অধীনে এই যন্ত্র কেনা হয়েছিল, তার নিজের ফোনালাপও শেষ পর্যন্ত রেকর্ড হয়ে, ফাঁস হয়ে, বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত হয়ে গেছে। এটাই ব্যাপক নজরদারির আসল চরিত্র — এটা নির্দিষ্ট কাউকে বেছে নেয় না, এটা সবাইকে গ্রাস করে নির্বিচারে। একজন সাংবাদিক যখন সোর্সের সাথে কথা বলেন, একজন ব্যবসায়ী যখন প্রতিযোগীর সাথে দর কষাকষি করেন, একজন মা যখন সন্তানের সাথে দুশ্চিন্তা ভাগ করেন — এদের কারো নামই কোনো তদন্তের তালিকায় নেই, তবু এদের কথাই একই ব্যবস্থার আওতায় পড়ে যেতে পারে, যে ব্যবস্থা একদিন প্রধানমন্ত্রীর কথাও ধরে ফেলেছিল।
আর এখানেই বাকস্বাধীনতার সবচেয়ে নীরব ক্ষতিটা ঘটে। কেউ সরাসরি বলছে না “এটা বলবেন না।” কিন্তু মানুষ নিজেই, না জেনে, নিজের কথা ছোট করে ফেলে — একটু বেশি সতর্ক, একটু বেশি সংযত। এই আত্ম-সেন্সরশিপ কোনো আইন দিয়ে চাপানো হয়নি, এটা তৈরি হয়েছে শুধু সম্ভাবনার ভয় থেকেই।
পরবর্তী ধাপ
এই প্রতিবেদন যা দেখালো তা হলো একটা সরলরেখা — বিদেশি যন্ত্র কেনা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় গোপন রেকর্ড তৈরি হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, শেষ পর্যন্ত বিদেশি গণমাধ্যমের হাতে পৌঁছেছে — এই পুরো চক্রে কোথাও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিজের হাতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এই ব্যবস্থার আসল দায়বদ্ধতা কোথায়, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই।
এই প্রশ্নের আরও সুনির্দিষ্ট উত্তরের জন্য, Bengal Gazette আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করছে —
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কাছে: উল্লেখিত নজরদারি যন্ত্রের আমদানি রেকর্ড, ব্যবহৃত HS কোড, ঘোষিত পণ্যের নাম ও শ্রেণিবিন্যাস
- বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (BTRC) কাছে: এই যন্ত্র আমদানি ও ব্যবহারের অনুমোদন সংক্রান্ত রেকর্ড
তথ্য হাতে এলে এই প্রতিবেদনের একটা পূর্ণাঙ্গ, তথ্যভিত্তিক পরবর্তী কিস্তি প্রকাশ করা হবে।
পদ্ধতি: এই প্রতিবেদন আল জাজিরা, হারেৎজ, দ্য ডেইলি স্টার, BBC Eye/BBC বাংলা, ওয়াশিংটন পোস্ট, CNN, CBS News, প্রথম আলো, এবং বাংলাদেশ সরকারের সরকারি আইন-পোর্টালের (bdlaws.minlaw.gov.bd, ictcp.gov.bd, ncsa.gov.bd) প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। যেসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি (যেমন খামেনি হত্যায় সুনির্দিষ্ট টার্গেটিং পদ্ধতি, কল রেকর্ড ফাঁসের প্রকৃত উৎস), সেগুলো স্পষ্টভাবে অনুমান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে না।
সংশোধনী নীতি: RTI-এর মাধ্যমে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে এই প্রতিবেদন হালনাগাদ হবে। তথ্যগত ভুল থাকলে জানান — right to reply ট্র্যাকার বা সম্পাদকীয় ইমেইলে।

