শিশু যখন সংবাদ;মিডিয়া হয় প্রভাবক-জনতা বিচারক
আইন একটি শিশুকে বিশেষ পরিচয় দিয়েছে বলেই তার বাড়তি সুরক্ষা পাওয়ার কথা। সেই পরিচয় নিয়েই সে জনতার আদালতে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে কীভাবে—রাষ্ট্র থেকে সংবাদকক্ষ পর্যন্ত সুরক্ষার শৃঙ্খলটি ঠিক কোথায় ভাঙছে, তার সন্ধান।
প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ: আবিরুজ্জামান · অনুসন্ধানী সাংবাদিক
গবেষণা ও ডেটা: মিডিয়া মনিটরিং ও আইনি অনুসন্ধান ডেস্ক, বেঙ্গল গেজেট
একটি ছবি। সেখানে কয়েকজন কিশোরের মুখ। একজনকে লাল গোল দাগ দিয়ে আলাদা করা। আরেকটা ফটোকার্ডে পাশাপাশি সারিবদ্ধ মুখ, সঙ্গে বিস্তারিত পরিচয়। কোথাও টিকটক ভিডিওর ফ্রেম, কোথাও হাতে দামি ফোন, আবার কোথাও বন্ধুমহলের আড্ডা। শিরোনাম আর হ্যাশট্যাগগুলো এমনভাবে দেওয়া, যা স্রেফ একটি হত্যাকাণ্ডের খবর জানাচ্ছে না—বরং পাশাপাশি আরেকটা গল্পও তৈরি করছে: এই শিশুরা আসলে কেমন ছিল?
তারপর শুরু হয় কমেন্ট বক্সের তাণ্ডব। সেখানে কোনো তদন্ত বা প্রমাণের ভাষা থাকে না, থাকে কেবল জনতার তৈরি রায়। কে ‘বখে গেছে’, কার পরিবার সন্তানকে ‘মানুষ করতে পারেনি’, আর কে ‘খুনি’—একটি বিচারাধীন ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভাবে প্রতিনিয়ত বসে যায় আরেক বিচার।
কিন্তু এই মানুষগুলোর অনেকেই তো শিশুটিকে আগে কখনো দেখেনি, চিনতও না।
তারা তাকে চিনল কীভাবে?
একটি ছবি থেকে। একটি নাম থেকে। স্কুলের পরিচয়, এলাকার নাম, বাবা-মায়ের পরিচয়, টিকটক অ্যাকাউন্ট কিংবা ছড়িয়ে পড়া পুরোনো কোনো ছবি থেকে।
একটি স্থানীয় ঘটনা এভাবেই নিমেষে একটি শিশুকে জাতীয় ডিজিটাল পরিসরে শনাক্তযোগ্য করে তুলতে পারে। খুলনার একটি শিশুকে ঢাকায় বসে কেউ চিনে ফেলে, কুমিল্লার একটি কিশোরের পুরোনো ভিডিও দেশের অন্য প্রান্তে বসে কেউ খুঁজে বের করে। যে মানুষটি শিশুটিকে জীবনে সামনাসামনি দেখেনি, সে-ও কেবল ইন্টারনেটে তার ছবি দেখে, তার জীবন ঘেঁটে নিজের একটি রায় লিখে দিয়ে চলে যায়।
তাহলে প্রশ্নটি শুধু কমেন্ট বক্সে থাকা বিচারকদের নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি শুরু হয় আরও আগে।
আমাদের রাষ্ট্র ও আইন এই শিশুদের একটি বিশেষ পরিচয় দিয়েছে—তারা ‘শিশু’। আর সেই পরিচয়ের কারণেই তাদের বাড়তি আইনি সুরক্ষা পাওয়ার কথা। তাহলে যে ‘শিশু’ পরিচয়টি তাদের সুরক্ষার সবচেয়ে বড় ঢাল হওয়ার কথা ছিল, সংবাদে এসে সেটিই তাদের নতুন ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে কীভাবে?
এটাই এই অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। এটি কেবল গণমাধ্যমের ভুলের গল্প নয়; বরং রাষ্ট্র, সংবাদকক্ষ, সমাজ এবং সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে শিশুর চারপাশে যে সুরক্ষার বলয় থাকার কথা—সেই শৃঙ্খলটি ঠিক কোথায় ভেঙে যাচ্ছে, সেটি খুঁজে দেখা।
যে সুরক্ষা শুরুতেই পাওয়ার কথা
রাষ্ট্র শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে, যা স্বীকার করা দরকার। ‘শিশু আইন, ২০১৩’-এর মাধ্যমে শিশুকে বিশেষ আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।
আইনের ২৮ ধারায় শিশু-আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলায় জড়িত বা সাক্ষ্যদানকারী শিশুকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা যায়—এমন ছবি, বর্ণনা, সংবাদ বা প্রতিবেদন প্রকাশে বিধিনিষেধ রয়েছে; তবে শিশু-আদালত যদি মনে করে প্রকাশ শিশুর স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হবে না, আদালত প্রকাশের অনুমতি দিতে পারে। ৮১ ধারায়ও বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে শিশুর স্বার্থের পরিপন্থী এবং তাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চিনিয়ে দেয়—এমন তথ্য বা ছবি প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। — শিশু আইন, ২০১৩, ধারা ২৮ ও ৮১
এটি শুধু নৈতিক নির্দেশনাও নয়—৮১ ধারার এই বিধান লঙ্ঘনের জন্য আইনেই দণ্ডের বিধান রয়েছে।
এর মানে এই নয় যে শিশুকে নিয়ে কোনো খবরই প্রকাশ করা যাবে না। একটি সংবাদ আইনের সীমানা ভাঙছে কি না, তা নির্ভর করে শিশুর বয়স, মামলার ধরন ও পর্যায়, তার আইনি অবস্থান এবং প্রচারিত তথ্য দিয়ে তাকে বাস্তবে শনাক্ত করা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর।
তবে মূল নীতিটি খুব সহজ ও পরিষ্কার।
কোনো শিশু অপরাধের খবরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে নিউজরুমের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—সে শিশু কি না, তার আইনি অবস্থান কী এবং তার পরিচয় প্রকাশের সীমা কতটুকু।
কারণ এই প্রশ্নটির উত্তর কোনো খবর প্রকাশের আগেই অনেক কিছু বদলে দিতে পারে।
ছবিটি ব্যবহার করা যাবে কি না। নাম লেখা যাবে কি না। স্কুলের নাম, এলাকা বা মা-বাবার পরিচয় মিলিয়ে তাকে চিনে ফেলা যাবে কি না। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগেই অভিযুক্ত শিশুকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, যেন তার বিচার আগেই শেষ হয়ে গেছে।
আর এখানেই আইনের গুরুত্ব কেবল আদালতের নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
একটি শিশুর নাম নেই, মুখ নেই, স্কুলের নাম নেই, ঠিকানা বা পরিবারের পরিচয় নেই—তাহলে দেশের অন্য প্রান্তে বসে কোনো অপরিচিত মানুষের পক্ষে সেই নির্দিষ্ট শিশুটিকে খুঁজে বের করে নিশানা বানানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘটনাটি তখনো সংবাদ থাকে। অপরাধটিও সংবাদ থাকে। তদন্তও সংবাদ থাকে।
কিন্তু শিশুটি নিজে আর জনতার বিচারের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে না।
আইন তাই কেবল ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরের বিষয় নয়; এটি সুরক্ষার প্রথম দরজা।
এই দরজাটি ঠিকমতো বন্ধ থাকলে যে অনৈতিক সাংবাদিকতার সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে, তা নয়। পরিচয় আড়াল করেও চটকদার শিরোনাম লেখা যায়, চরিত্রহনন করা যায় কিংবা একটি শিশুকে ঘিরে নৈতিক বিচার চালু করা যায়। সেখানেই প্রয়োজন সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার।
কিন্তু আইন অন্তত প্রথম দেয়ালটি তুলে দিতে পারে—একটি বাস্তব শিশুকে নাম, মুখ ও পরিচয়সহ জনতার আদালতের সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিরুদ্ধে।
আইন সেই দেয়ালের প্রথম ভিত্তি, আর পেশাদারি নৈতিকতা তাকে আরও উঁচু করে তোলে।
কাগজে-কলমে সেই দেয়াল রয়েছে। আসল প্রশ্ন হলো—সংবাদ প্রকাশের মুহূর্তে সেটি বাস্তবে দাঁড়িয়ে থাকছে কি না।
প্রহরী যখন নিজেই ঝুঁকির কারণ
রাষ্ট্র বা সমাজের কোনো প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও ব্যর্থতা মানুষের সামনে আনা সাংবাদিকতার প্রধান কাজ। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম প্রতিনিয়ত শিশু নির্যাতন উন্মোচন করেছে, মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের নীরবতা ভেঙেছে, কিংবা শিশুদের জন্য সরকারের বরাদ্দ করা অর্থ বাস্তবে কাজে আসছে কি না—তার সন্ধান করেছে।
২০২১ সালে ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে নীলিমা জাহানের একটি অনুসন্ধান ‘শিশুদের জন্য সরকারি বিনিয়োগ’ বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছিল। প্রতিবেদনটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে ২৮৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা নিয়ে। কেবল বাজেট বরাদ্দ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না—সেই টাকা শিশুর কাজে আসছে কি না, সাংবাদিকতা সেই হিসাবটিই আদায় করতে চেয়েছিল।
কিন্তু এবার সেই একই হিসাব সংবাদমাধ্যমের নিজের কাছেও চাওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের গলদ উন্মোচন করতে গিয়ে গণমাধ্যম নিজেই কি শিশুর জন্য আরেকটা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে?
কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলো পাশাপাশি রাখলে এই প্রশ্নটি তীব্রভাবে সামনে আসে। এখানে আইনের দৃষ্টিতে তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা অবস্থান রয়েছে: নিহত ভুক্তভোগী শিশু; অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্ত শিশু (যারা আদালতের সিদ্ধান্তের আগে দোষী সাব্যস্ত নয়); এবং যদি কোনো সম্পর্কহীন মানুষের পুরোনো ছবি ভুলভাবে অভিযুক্তের পরিচয়ে ছড়িয়ে থাকে, তবে সেই ব্যক্তি আদৌ ওই মামলার অভিযুক্ত নন।
আইনের চোখে এই তিনটি অবস্থান আলাদা। কিন্তু ডিজিটাল সংবাদপ্রবাহে সেই পার্থক্য সহজেই ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
অভিযুক্তদের টিকটক অ্যাকাউন্টের বিবরণ, দামি ফোন বা বন্ধুমহলের তথ্য অপরাধের তদন্তে হয়তো কখনো প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু সেই তথ্য ব্যবহার করে শিশুটির চরিত্রের সামাজিক বিচার শুরু করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
প্রশ্নটি হলো—অপরাধটি বুঝতে কোন তথ্য দরকার, আর শিশুটিকে সামাজিকভাবে বিচার করতে কোন তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে?
এ দুটি এক বিষয় নয়।
আমাদের সমাজে কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কিছু পুরোনো সামাজিক ধারণা আগে থেকেই গেঁথে আছে। কিশোর ছেলেদের ক্ষেত্রে দামি ফোন, টিকটক, বন্ধুমহল, ‘কিশোর গ্যাং’ বা ‘বখে যাওয়া’; আর কিশোরীদের ক্ষেত্রে প্রেম, সম্পর্ক, পোশাক কিংবা চালচলন।
প্রতিটি সংবাদমাধ্যম প্রতিটি শিশুকে এভাবে উপস্থাপন করে—এমন দাবি এখানে করা হচ্ছে না। কিন্তু কোনো অপরাধের সংবাদের সঙ্গে যখন এই চেনা ধারণাগুলো মিলিয়ে দেওয়া হয়, তখন জটিল এক সামাজিক বা মনস্তাত্ত্বিক ঘটনার বিশ্লেষণ ছেড়ে শিশুটিকে কয়েকটি সহজ তকমায় নামিয়ে আনা নিউজরুমের জন্য খুব সহজ হয়ে যায়।
তখন পরিবারও রেহাই পায় না। মা-বাবা সন্তানকে কীভাবে বড় করেছেন, তাদের সামাজিক পরিচয় কী—এসব প্রশ্ন মূল অপরাধের প্রমাণ থেকে নজর সরিয়ে এক অন্যায্য বিচার তৈরি করে।
‘পুলিশ বলছে’ থেকে যখন হয়ে যায় সত্য
অপ্রতিমের ঘটনাটি একা হলে এটিকে বিচ্ছিন্ন ভুল বলা যেত। কিন্তু খুলনার নির্জনার মৃত্যুর খবরগুলো আবার পরীক্ষা করলেও একই ধরনের কাঠামোগত সমস্যা চোখে পড়ে।
সব সংবাদমাধ্যম অবশ্য একইভাবে রিপোর্ট করেনি। সব শিরোনামও এক রকম ছিল না।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর স্পষ্ট ধরা পড়ে।
প্রতিবেদনের মূল লেখায় কোনো তথ্য ‘পুলিশ বলছে’ হিসেবে থাকলেও, শিরোনামে গিয়ে সেই পুলিশি দাবির সংশয়টুকু দুর্বল হয়ে যায়। একই খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফটোকার্ডে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরও নিশ্চিত সত্যের মতো শোনায়।
অর্থাৎ, খবরটি একেকটি ধাপ পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের অনিশ্চয়তাগুলো হারাতে থাকে। পুলিশি ব্রিফিং থেকে প্রতিবেদন, প্রতিবেদন থেকে শিরোনাম, সেখান থেকে ফটোকার্ড হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—এই যাত্রায় ‘পুলিশ বলছে’ কথাটি হারিয়ে গিয়ে একটি প্রাথমিক অভিযোগই প্রতিষ্ঠিত সত্যের মতো সামনে আসতে পারে।
আর ভুক্তভোগী বা অভিযুক্ত শিশুটি তখন শুধু একটি সংবাদের মানুষ থাকে না; তাকে ঘিরে একটি নির্দিষ্ট ‘চরিত্র’ তৈরি হতে শুরু করে।
জনতার আদালত ও মনোযোগের বাজার
সংবাদমাধ্যম কোনো একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করলেই গল্প কিন্তু সেখানে শেষ হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেটিকে বহুগুণ ছড়িয়ে দেয়, আর জনতার একাংশ সেই তথ্যের ওপর ভর করে নিজস্ব বিচার শুরু করে।
এ ক্ষেত্রে কেবল অ্যালগরিদমকে একতরফা দায়ী করা ঠিক হবে না। প্ল্যাটফর্মের বিতরণব্যবস্থা মানুষের দেখা, কমেন্ট বা শেয়ারের ওপর ভিত্তি করে কনটেন্ট সামনে আনতে পারে; কিন্তু সেই পোস্টের শিরোনাম লেখে মানুষ, ছবি বেছে নেয় মানুষ, লাল বৃত্ত আঁকে মানুষ, আর প্রকাশের বোতামটিও চাপেন একজন মানুষই।
অ্যালগরিদমের দোহাই দিয়ে তাই নিউজরুম নিজের দায় এড়াতে পারে না।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘মনোযোগের অর্থনীতি’ (Attention Economy)। ডিজিটাল সংবাদে ক্লিক, ভিউ, দেখার সময় ও মানুষের প্রতিক্রিয়ার অর্থনৈতিক মূল্য থাকতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে কোনো নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যম শুধুই টাকা আয়ের উদ্দেশ্যে একটি শিশুকে এভাবে তুলে ধরেছে। প্রমাণ ছাড়া এমন উদ্দেশ্য আরোপ করা সম্ভব নয়।
প্রশ্নটি বরং সংবাদবাজারের কাঠামোগত প্রণোদনার।
একটি হত্যাকাণ্ড, তারপর গ্রেপ্তার, তারপর জিজ্ঞাসাবাদ, টিকটক ভিডিও, দামি ফোন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বন্ধুমহল—একটি আলোচিত ঘটনা থেকে ক্রমাগত নতুন কনটেন্ট তৈরির সুযোগ আসতে থাকে। সেখানে সম্পাদককে থমকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হবে: এই নতুন খবরটি কি সত্যিই জনস্বার্থের নতুন কোনো তথ্য দিচ্ছে, নাকি একই শিশুকে আবার নতুন করে খবরের উপাদান বানানো হচ্ছে?
এখানে আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ ব্যবহারকারী নিজে থানায় গিয়ে মামলার ফাইল সংগ্রহ করেন না। অধিকাংশ মানুষ একটি ঘটনা প্রথম দেখেন কোনো সংবাদমাধ্যম, ফটোকার্ড, ভিডিও কিংবা শেয়ার হওয়া পোস্টে।
সেখানেই তারা নাম পান, মুখ দেখেন, স্কুলের নাম জানেন, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডির সন্ধান পান।
তারপর সেই তথ্যটি আর সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
স্ক্রিনশট হয়, শেয়ার হয়, অন্য পেজে কপি হয়, ব্যক্তিগত আইডিতে পোস্ট হয়, আর কমেন্ট বক্সে আবার সেই ছবি ছড়াতে থাকে।
অর্থাৎ, সংবাদকক্ষের একটি প্রকাশের সিদ্ধান্তই এমন একটি পরিচয় অনলাইন জগতে উন্মুক্ত করে দিতে পারে, যা পরে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এই কারণেই সুরক্ষার প্রথম দরজাটি এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি এমন এক সামাজিক পরিবেশে ঘটছে, যেখানে সবার সংবাদ যাচাই ও বুঝে পড়ার ক্ষমতা সমান নয়।
২০২০ সালে এমআরডিআই (MRDI) ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহায়তায় পরিচালিত জাতীয় সংবাদ-সাক্ষরতা সমীক্ষায় ১,২০৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য নেওয়া হয়েছিল। সেই সমীক্ষার সূচক অনুযায়ী, ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা ছিলেন ‘কম সংবাদ-সাক্ষরতা’র দলে। ৬৩.৬ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, অনলাইনে এমন সংবাদ তারা পেয়েছেন, যা প্রথমে সত্য মনে হলেও পরে ভুয়া বলে টের পেয়েছেন। আর শিশু হত্যা, মাদক বা যৌন হয়রানির মতো অপরাধে জড়িত থাকলে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা উচিত—এই বক্তব্যের পক্ষে ১৬.৪ শতাংশ একমত এবং ১২.৯ শতাংশ দৃঢ়ভাবে একমত হয়েছিল (মোট ২৯.৩ শতাংশ)। — News Literacy in Bangladesh: National Survey, MRDI & UNICEF Bangladesh, ২০২০
এই তথ্য দিয়ে এটি বলা যাবে না যে তারা শিশু আইন জানেন না, সমীক্ষা সেটি মাপেনি।
তবে এটি স্পষ্ট দেখায় যে শিশু-পরিচয় প্রকাশের প্রশ্নে সমাজের একটি অংশের দৃষ্টিভঙ্গি সুরক্ষামুখী আইনের কাঠামোর সঙ্গে মেলে না। এমন জায়গায় একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের নাম ও লোগো পাঠকের কাছে তথ্যটির বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাই পেশাদার সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব কমে না; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আইন বইয়ে আছে, প্রকাশের সময় কোথায়?
শিশু সম্পর্কিত সংবেদনশীল সাংবাদিকতা নিয়ে বাংলাদেশে নানা আলোচনা হয়েছে, নির্দেশিকা তৈরি হয়েছে, প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, সংবাদমাধ্যমকে সতর্কও করা হয়েছে।
কিন্তু এত কিছুর আগে খুব সাধারণ একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।
যেটি স্রেফ পরামর্শ বা নির্দেশিকা নয়, সরাসরি আইন—সেটি মানা হচ্ছে কি?
কারণ নৈতিকতা সাংবাদিককে শেখায় কী করা উচিত; আর আইন নির্দিষ্ট সীমানা একে দেয় কোন জায়গাটি অতিক্রম করা যাবে না।
কোনো প্রকাশনা সেই আইনি সীমা অতিক্রম করেছে কি না, তা প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে নির্ধারণের বিষয়। সাংবাদিকের কাজ আদালতের আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা নয়। কিন্তু প্রকাশিত ছবি, নাম, শিরোনাম ও অন্যান্য তথ্য সামনে রেখে এই প্রশ্নটি তোলা যায়—আইন যে শিশুটিকে নিরাপত্তা দিয়েছে, প্রকাশের মুহূর্তে সেই সুরক্ষা কোথায় ছিল?
আর আইন যদি কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি থাকে, কিন্তু প্রকাশের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব না ফেলে, তবে শিশুটি সেই আইনি প্রতিরক্ষা পেল কোথায়?
আইনের উপস্থিতি সবচেয়ে কার্যকর হয় তখনই, যখন তা কোনো খবর প্রকাশের আগেই নিউজরুমের একটি ভুল সিদ্ধান্ত বদলে দেয়।
ছবি সম্পাদক যখন মুখটি দেখে থামবেন, কপি সম্পাদক যখন স্কুলের নামটি দেখে ভাববেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বে থাকা সম্পাদক যখন ফটোকার্ডটি প্রকাশের আগে থমকে দাঁড়াবেন, আর সম্পাদক যখন জিজ্ঞেস করবেন—সে কি শিশু?
তখন শিশু আইন কেবল কোনো প্রশিক্ষণের প্রেজেন্টেশনে থাকবে না; তা হয়ে উঠবে নিউজরুমের প্রতিদিনের কাজের অংশ।
আর কোনো ঘটনায় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যদি আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত হয়, তবে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় হয়ে থাকে না। অন্য সংবাদকক্ষগুলোও তখন বুঝতে পারে—শিশুর পরিচয় প্রকাশ স্রেফ সম্পাদকীয় পছন্দের বিষয় নয়; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনি সীমা লঙ্ঘনের জন্য শাস্তির বিধানও রয়েছে।
ঠিক তখনই একটি আইন কাগজ থেকে উঠে এসে সত্যিকারের দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।
ক্ষতি হলে পরিবার যাবে কোথায়?
কিন্তু কোনো দেয়ালই তো সবসময় অটুট থাকে না।
যখন কোনো শিশুর ছবি বা ভুল পরিচয় অনলাইনে ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেই পরিবার বাস্তবে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
আইনি সহায়তা সংস্থা, শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা এনজিও কিংবা সাংবাদিক সংগঠনগুলো নিজ নিজ জায়গা থেকে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তারা তো আর রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না।
একটি বিপন্ন পরিবারকে কেন স্ক্রিনশট হাতে নিয়ে নিজে আইনি বই পড়তে হবে, নিউজরুমের নম্বর খুঁজতে হবে, আর একা পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে হবে?
সহায়তার ব্যবস্থা থাকা আর সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই সহায়তায় পৌঁছাতে পারা—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বাস্তব বিষয়।
তাই শিশু-সংক্রান্ত ভুল বা ক্ষতিকর প্রকাশনার ক্ষেত্রে একটি সহজ ও দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকা দরকার। পরিবার যেন জানে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, কে দ্রুত বিষয়টি দেখবে, কোথায় সংবাদ অপসারণ বা সংশোধন চাওয়া যাবে এবং প্রয়োজন হলে কোথা থেকে আইনি সাহায্য মিলবে।
আর নিয়মটি খুব সহজ হওয়া উচিত—
ভুল যে মাধ্যমে ছড়াবে, সংশোধনকেও সেই মাধ্যমেই পৌঁছাতে হবে।
ফটোকার্ডে ভুল ছড়িয়ে পড়লে পরদিন ওয়েবসাইটের ভেতরের একটি অনুচ্ছেদ নীরবে বদলে দিলেই প্রতিকার হয় না। যারা সেই ভুল ফটোকার্ড দেখেছেন, সংশোধনটি যথাসম্ভব তাদের সামনেই পৌঁছানো দরকার।
সাংবিধানিক প্রতিকারের পথ
কোনো ঘটনায় যদি মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বা সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রশ্ন ওঠে, তবে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রতিকারের পথও খোলা রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার বলবৎ করতে ১০২(১) অনুচ্ছেদ মতে হাইকোর্ট বিভাগে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। আর ১০২ অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট বিভাগকে উপযুক্ত ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নির্দেশ বা আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। — গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ৪৪ ও ১০২ অনুচ্ছেদ
জনস্বার্থের কোনো প্রশ্নে একটি bona fide দেশীয় সংগঠনও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ‘person aggrieved’ হিসেবে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে—এই অবস্থানকে Dr. Mohiuddin Farooque v. Bangladesh মামলার নজির শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।
এর মানে এই নয় যে আদালত সংবাদমাধ্যমের দৈনন্দিন কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করবে, কিংবা প্রতিটি ভুল বা ক্ষতিকর সংবাদ সরাসরি সাংবিধানিক মামলার বিষয় হয়ে উঠবে। কিন্তু উপযুক্ত ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার বা জনকর্তব্যের প্রশ্ন উঠলে সাংবিধানিক বিচারিক প্রতিকারের পথ খোলা থাকে।
এই জায়গায় এসে পুরো ছবিটা একসঙ্গে দেখা যায়:
আইন শিশুকে চিনেছে এবং বিশেষ সুরক্ষা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সেই সুরক্ষা বাস্তবায়ন করার কথা। সংবাদমাধ্যমের কাজ সেই আইনি সুরক্ষার দেয়াল ভেঙে দেওয়া নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনতার রায় আদালতের বিচার নয়। ক্ষতি হলে প্রতিকারের পথ থাকার কথা, আর ক্ষেত্রবিশেষে সাংবিধানিক প্রতিকারের দরজাও খোলা।
তারপরও একটি শিশু এই পুরো ব্যবস্থার মাঝখানে দাঁড়িয়ে চরম অরক্ষিত থেকে যেতে পারে।
তাহলে প্রশ্নটি শুধুই ‘কে ভুল করল’ তা নয়।
প্রশ্ন হলো—সুরক্ষার মূল শৃঙ্খলটি ঠিক কোথায় ভাঙছে?
আইন প্রয়োগে? সংবাদকক্ষের সিদ্ধান্তে? সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানোর জায়গায়? নাকি ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর প্রতিকার পাওয়ার পথে?
সমাধানও সেই ভাঙা জায়গাগুলোতে খুঁজতে হবে।
মৃত শিশুর সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব
এক মুহূর্তের জন্য এই সংবাদের মানুষগুলোকে কোনো বাইরের চরিত্র না ভেবে নিজের পরিবারের কেউ হিসেবে চিন্তা করুন।
অপ্রতিম যদি আপনার নিজের সন্তান হতো? আপনার ছোট ভাই হতো?
তার মৃত্যুর পর তার পরিবার অন্তত কথা বলতে পারছে, ভুল খবরের প্রতিবাদ জানাতে পারছে।
কিন্তু যে শিশুটি মারা গেছে, তার নিজের তো সেই সুযোগটুকুও নেই।
আর খুলনার নির্জনা?
মৃত্যুর পর তার ছবি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে যখন নতুন নতুন শিরোনাম তৈরি হয়, নির্জনা আর কবর থেকে ফিরে এসে বলতে পারবে না—‘এটি পুরো সত্য নয়।’
সে তার ছবি ফিরিয়ে নিতে পারবে না, তার সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিতে পারবে না, কিংবা নিজের সম্পর্কে তৈরি করা খবরের বিরুদ্ধে নিজের পক্ষে দাঁড়াতে পারবে না।
মৃত্যুর পর নিজের নামে ছড়িয়ে পড়া খবরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না পারাটাই একজন মৃত শিশুর সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব।
আর তাই মৃত শিশুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংযত থাকার দায় জীবিতদের—পুলিশের, প্রতিবেদকের, সম্পাদকের, প্রতিষ্ঠানের এবং আমাদের সমাজের।
শিশুটিকে রক্ষা করবে কে?
শুরুতে দেখা সেই ছবিটির কথা আবার ভাবুন।
কয়েকটি মুখ। একটি লাল গোল দাগ। একটি নাম। একটি স্কুল। একটি টিকটক আইডি। তারপর হাজার হাজার মানুষের সামনে একটি খোলা শিশু।
এই পুরো ঘটনাটি উল্টোও হতে পারত।
ছবি বাছাইয়ের টেবিলে কেউ থামতে পারতেন, নাম লেখার সময় কেউ ভাবতে পারতেন, স্কুলের পরিচয়ের জায়গায় কেউ আটকে যেতে পারতেন, কিংবা ফটোকার্ড প্রকাশের আগে কেউ স্রেফ একটি প্রশ্ন করতে পারতেন—
সে কি শিশু?
সমস্যা শিশুটির পরিচয় থাকা নিয়ে নয়; সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ‘সে শিশু’—এই তথ্যটি তার সুরক্ষা চালু করার বদলে তাকে আরও বেশি দৃশ্যমান, অন্যায্য বিচারযোগ্য ও অরক্ষিত বানিয়ে ফেলে।
নিহত শিশুর হত্যার বিচার আদালতেই হবে। অভিযুক্ত শিশুর দায়ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতই ঠিক করবে। ভুক্তভোগী শিশুর ব্যক্তিগত জীবন অপরাধের আড়াল হতে পারে না; অভিযুক্ত শিশুর মুখ রায়ের আগেই সামাজিক শাস্তির ব্যানার হতে পারে না; আর একজন সম্পর্কহীন মানুষের পুরোনো ছবি দিয়ে তাকে অন্য মামলার আসামি হিসেবে তুলে ধরা যায় না।
গণমাধ্যম যখন সংবাদ পরিবেশন করে, তার দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা; গণমাধ্যম যখন প্রহরী, তার দায়িত্ব ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। আর নিজের সংবাদের প্রভাব যখন একটি শিশুর জীবনে গিয়ে আঘাত করে, তখন সেই ফলাফলের দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ সংবাদমাধ্যমের থাকে না।
তাহলে শিশুটিকে রক্ষা করবে কে?
উত্তরটি তার পরিচয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।
তাকে রক্ষা করবে তার ‘শিশু’ পরিচয়।
এই পরিচয় দেখেই আইন সক্রিয় হওয়ার কথা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সুরক্ষা দেওয়ার কথা, সংবাদকক্ষের হাত থেমে যাওয়ার কথা, আর অধিকার ক্ষুণ্ন হলে বিচার পাওয়ার পথ খোলা থাকার কথা।
এই সুরক্ষা কোনো দয়া বা করুণা নয়, কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পুরস্কারও নয়।
তার পরিবার কতটা শক্তিশালী, ঘটনাটি কতটা তোলপাড় তৈরি করেছে, কিংবা কত মানুষ তার জন্য কাঁদছে—কোনোটাই তার আইনি সুরক্ষার শর্ত হতে পারে না।
শর্ত একটাই—
সে শিশু।
সে ভুক্তভোগী হলেও শিশু, অভিযুক্ত হলেও শিশু, সাক্ষী হলেও শিশু, এমনকি মারা গেলেও তার শিশু পরিচয়টি হারিয়ে যায় না।
আর সেই পরিচয়টি যদি সত্যিই সুরক্ষার প্রথম দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারে, তবেই হয়তো পরেরবার কোনো শিশুর মুখে লাল গোল দাগ দেওয়ার আগে কেউ একজন হাত থামাবেন।
কারণ আইন প্রথমেই যে সত্যটি সবাইকে মনে করিয়ে দেয়—
তার ‘শিশু’ পরিচয়ই হবে তার সুরক্ষার অধিকার।


